বাংলাদেশের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তার সেনাপ্রধান থাকাকালীন সময়ে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর কিছু সদস্য বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) কার্যালয়ের অভ্যন্তরে আলাদা কক্ষে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করত। মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকীর ছত্রছায়ায় পরিচালিত এই তৎপরতার মাধ্যমে ‘র’ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা সরবরাহ করত, যা ডিজিএফআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হতো।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গুম-খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দেওয়ার সময় সাবেক সেনাপ্রধান এই বিস্ফোরক তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সেনাপ্রধান হিসেবে বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ তার ছিল। আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট এবং ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের মতো সংস্থা ছাড়াও র্যাবের কর্মকর্তা এবং অন্যান্যদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারতেন। এই সূত্রগুলো থেকেই তিনি জানতে পারেন যে, সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের ভুল পথে চালিত করা হচ্ছে এবং তাদের ব্যবহার করে ভিন্ন উদ্দেশ্য সাধন করা হচ্ছে।
জবানবন্দিতে জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া এই বিষয়ে তিনটি নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ করেন। প্রথমত, তিনি এক কনিষ্ঠ অফিসারের কথা বলেন যিনি র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এই অফিসার স্বীকার করেন যে তিনি ছয়জন ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন, যার মধ্যে দুজনকে সরাসরি এবং বাকি চারজনকে হত্যার সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রতিটি হত্যার জন্য তিনি ১০ হাজার টাকা করে পেয়েছিলেন এবং সেই টাকা গ্রামের মসজিদে দান করে দিয়েছেন। এই ঘটনা থেকে জেনারেল ভূঁইয়া বুঝতে পারেন যে অফিসারটি অনিচ্ছাকৃতভাবে এই অপরাধমূলক কাজগুলো করেছেন এবং অনুশোচনা থেকেই তিনি অর্থ দান করেছেন।
দ্বিতীয়ত, একজন লে. কর্নেল তার সঙ্গে দেখা করতে আসলে তিনি জানতে পারেন যে ওই অফিসারও ছয়জনকে হত্যা করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালনের কথা বলেন। জেনারেল ভূঁইয়া তাকে প্রশ্ন করেন, তিনি (জেনারেল) যদি তাকে তার মল খেতে বলেন, তবে তিনি কি তা করবেন? অফিসারটি উত্তর দেয়, না। তখন জেনারেল তাকে নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং মল খাওয়ার মধ্যে কোনটি নিকৃষ্টতর তা জিজ্ঞাসা করলে, অফিসারটি নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করাকে নিকৃষ্টতর বলে স্বীকার করে। কেন তিনি আদেশ পালন করেছেন, এই প্রশ্নের উত্তরে অফিসারটি নীরব থাকে।
তৃতীয়ত, জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া একজন মেজরের ঘটনার কথা বলেন, যিনি পূর্বে তার সঙ্গে কাজ করেছেন। র্যাবে পোস্টিং হওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে ওই মেজর হোটেল রেডিসনে কর্মরত এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের হত্যা করেছেন। জেনারেল ভূঁইয়া তাকে প্রশ্ন করেন কেন তিনি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। মেজর উত্তরে বলেন যে ওই ব্যক্তিরা সমাজবিরোধী এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। জেনারেল তাকে মনে করিয়ে দেন যে আইন ভঙ্গ করে হত্যা করার মাধ্যমে তিনিও সমাজবিরোধী। এই ঘটনায় তিনি মেজরকে প্রতিজ্ঞা করিয়েছিলেন যে তিনি র্যাবে আর এমন কাজ করবেন না। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি হতাশ হন যখন তিনি দেখেন যে ওই মেজর ফেসবুকে শাপলা চত্বরের পটভূমিতে কর্নেল জিয়াউলের সঙ্গে দাঁড়িয়ে একটি ছবি পোস্ট করেছেন।
সাবেক সেনাপ্রধান বলেন, এই ঘটনাগুলো অসংখ্য উদাহরণের মধ্যে কয়েকটি মাত্র, যা সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের উপর বিরূপ প্রভাব এবং তাদের ভুল পথে চালিত করার চিত্র তুলে ধরে।
রিপোর্টারের নাম 























