ঢাকা ০১:৩৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬

আস্থাহীনতার সংকটে ঢাকা-দিল্লি: কেন ভারতবিরোধী হয়ে উঠছে বাংলাদেশের তরুণরা?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:২২:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো এখন আর কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়, বরং তারুণ্যের ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত ক্যানভাস। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে ফুটে ওঠা তীক্ষ্ণ গ্রাফিতি ও স্লোগানগুলো জানান দিচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণ এখন এক নজিরবিহীন আস্থাহীনতার মুখে দাঁড়িয়ে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাইয়ের সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে ভারত প্রত্যর্পণ না করায় ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটছে, তখন তরুণদের আলোচনায় ঘরোয়া রাজনীতির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দিল্লির ‘আঞ্চলিক আধিপত্য’ বা ‘হেজেমনি’র বিষয়টি।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের মতে, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভারতের প্রশ্নাতীত সমর্থন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মোশাররফ হোসেনের ভাষায়, তরুণরা মনে করে ভারত দীর্ঘকাল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে, যা বিশেষ করে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে প্রবল আকার ধারণ করে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা”র মতো স্লোগানে, যা এখন রাজপথ ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়েও জায়গা করে নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অভিনাশ পালিওয়ালের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট এবং ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান—এই দুইয়ের চাপে দিল্লি এখন ঢাকা নিয়ে বেশ বিপাকে। কেবল রাজনৈতিক সমর্থনই নয়, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন সমস্যা এবং বাণিজ্য বৈষম্য এই অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালছে।

সম্প্রতি ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বিষয়টিকে ‘বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা’ হিসেবে অভিহিত করে ভারতীয় সাংবাদিকদের সরেজমিনে বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুই দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা অনস্বীকার্য হলেও গত ১৫ বছরের ভোটাধিকার হরণের ক্ষোভকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি দীর্ঘ সময় ধরে ‘রাষ্ট্র-রাষ্ট্র’ সম্পর্কের চেয়ে ‘ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক’ সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল। এই একপাক্ষিক নির্ভরতা এবং নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করেছে। ফলে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হলে দিল্লিকে পুরনো ‘ম্যানেজ’ করার নীতি ত্যাগ করে সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে এগোতে হবে।

তবে এই ক্ষোভ কি কেবলই শত্রুতা? ইনকিলাব মঞ্চের কর্মী ফাতিমা তাসনিম জুমার কথায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন মাত্রা। তিনি বলছেন, এই বিরোধিতা ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও মনে করেন, একটি টেকসই সম্পর্কের জন্য জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন জরুরি। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোও এখন ভারতের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ওপর জোর দিচ্ছে।

ভৌগোলিক বাস্তবতা ও দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে দুই দেশ হয়তো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না, কিন্তু বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন এমন এক সম্পর্কের স্বপ্ন দেখছে যেখানে ‘বড় ভাই’ সুলভ আচরণ নয়, বরং থাকবে সমতার ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব। আস্থার এই ভাঙন জোড়া লাগানোই এখন ঢাকা ও দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতিতে ইরানের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি: যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রতি কড়া বার্তা

আস্থাহীনতার সংকটে ঢাকা-দিল্লি: কেন ভারতবিরোধী হয়ে উঠছে বাংলাদেশের তরুণরা?

আপডেট সময় : ০৩:২২:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো এখন আর কেবল ইট-পাথরের কাঠামো নয়, বরং তারুণ্যের ক্ষোভ ও আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত ক্যানভাস। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে ফুটে ওঠা তীক্ষ্ণ গ্রাফিতি ও স্লোগানগুলো জানান দিচ্ছে এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে শেখ হাসিনার ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের সমীকরণ এখন এক নজিরবিহীন আস্থাহীনতার মুখে দাঁড়িয়ে।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বিশেষ করে জুলাইয়ের সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনাকে ভারত প্রত্যর্পণ না করায় ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়েছে। আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ ঘটছে, তখন তরুণদের আলোচনায় ঘরোয়া রাজনীতির চেয়েও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দিল্লির ‘আঞ্চলিক আধিপত্য’ বা ‘হেজেমনি’র বিষয়টি।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের মতে, গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভারতের প্রশ্নাতীত সমর্থন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র মোশাররফ হোসেনের ভাষায়, তরুণরা মনে করে ভারত দীর্ঘকাল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছে, যা বিশেষ করে ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের পর থেকে প্রবল আকার ধারণ করে। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে “দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা”র মতো স্লোগানে, যা এখন রাজপথ ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের হৃদয়েও জায়গা করে নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অভিনাশ পালিওয়ালের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ভারতবিরোধী সেন্টিমেন্ট এবং ভারতের নিজস্ব রাজনৈতিক বয়ান—এই দুইয়ের চাপে দিল্লি এখন ঢাকা নিয়ে বেশ বিপাকে। কেবল রাজনৈতিক সমর্থনই নয়, সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নাগরিক হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন সমস্যা এবং বাণিজ্য বৈষম্য এই অসন্তোষের আগুনে ঘি ঢালছে।

সম্প্রতি ভারতীয় কিছু গণমাধ্যমে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু পরিস্থিতি নিয়ে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও সাধারণ মানুষের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বিষয়টিকে ‘বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা’ হিসেবে অভিহিত করে ভারতীয় সাংবাদিকদের সরেজমিনে বাংলাদেশ সফরের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুই দেশের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা অনস্বীকার্য হলেও গত ১৫ বছরের ভোটাধিকার হরণের ক্ষোভকে অস্বীকার করার উপায় নেই।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আলী রিয়াজের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কটি দীর্ঘ সময় ধরে ‘রাষ্ট্র-রাষ্ট্র’ সম্পর্কের চেয়ে ‘ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক’ সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল। এই একপাক্ষিক নির্ভরতা এবং নির্দিষ্ট শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করেছে। ফলে সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হলে দিল্লিকে পুরনো ‘ম্যানেজ’ করার নীতি ত্যাগ করে সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে এগোতে হবে।

তবে এই ক্ষোভ কি কেবলই শত্রুতা? ইনকিলাব মঞ্চের কর্মী ফাতিমা তাসনিম জুমার কথায় উঠে এসেছে এক ভিন্ন মাত্রা। তিনি বলছেন, এই বিরোধিতা ভারতীয় জনগণের বিরুদ্ধে নয়, বরং দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারাও মনে করেন, একটি টেকসই সম্পর্কের জন্য জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন জরুরি। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোও এখন ভারতের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমমর্যাদার ওপর জোর দিচ্ছে।

ভৌগোলিক বাস্তবতা ও দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কারণে দুই দেশ হয়তো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারবে না, কিন্তু বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এখন এমন এক সম্পর্কের স্বপ্ন দেখছে যেখানে ‘বড় ভাই’ সুলভ আচরণ নয়, বরং থাকবে সমতার ভিত্তিতে অংশীদারিত্ব। আস্থার এই ভাঙন জোড়া লাগানোই এখন ঢাকা ও দিল্লির জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।