আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরের শাসনামলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানের বিচার প্রক্রিয়া আজ রবিবার শুরু হচ্ছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক বেঞ্চে প্রসিকিউশনের প্রারম্ভিক বক্তব্যের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের সূচনা হবে।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন—বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। মামলার কার্যসূচি অনুযায়ী, আজ জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করার কথা রয়েছে। এর আগে, গত ১৪ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগসমূহ আমলে নিয়ে এবং অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মূলত তিনটি প্রধান অভিযোগ উপস্থাপন করেছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই গভীর রাতে র্যাব সদর দপ্তর থেকে সজলসহ তিনজনকে অবৈধভাবে আটক করে গাজীপুরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা বাইপাস সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাড়ি থামিয়ে জিয়াউল আহসানের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ও উপস্থিতিতে চোখ-হাত বাঁধা অবস্থায় ওই তিন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বরগুনার পাথরঘাটা ও বলেশ্বর নদীর মোহনায় সংঘটিত নৃশংসতার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে পাথরঘাটার চরদুয়ানী এলাকা ছিল হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। গভীর রাতে বন্দিদের নৌযানে করে মাঝনদীতে নিয়ে বুক বা মাথায় বালিশ চাপা দিয়ে গুলি করা হতো। এরপর লাশের পেট কেটে সিমেন্টের ব্লক বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো। এই বিশেষ ঘাতক পদ্ধতিকে ‘গেস্টাপো’ বা ‘গলফ’ কোডনামে অভিহিত করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় সাবেক বিডিআর সদস্য নজরুল ইসলাম মল্লিক ও আলকাছ মল্লিকসহ অন্তত ৫০ জনকে হত্যার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের বনদস্যু দমনের আড়ালে পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড চালানো হতো। আগে থেকে গুম বা আটকে রাখা ব্যক্তিদের বনদস্যু সাজিয়ে গভীর রাতে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে গিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ার’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হতো। র্যাবের বিশেষ একটি দলের মাধ্যমে পরিচালিত এসব অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে জিয়াউল আহসান নিজেই সশরীরে উপস্থিত থাকতেন। ‘অপারেশন নিশানখালী’, ‘অপারেশন মরা ভোলা’ ও ‘অপারেশন কটকা’—এই তিনটি অভিযানের নামে অন্তত ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এসব বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ও গুমের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় আজ থেকে শুরু হওয়া এই বিচারিক প্রক্রিয়াকে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























