ঢাকা ০৬:১১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সংসদ ভবন এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ থেকে সরকার কিছুটা সরে এসেছে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:২২:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের জন্য বর্তমানে যে দুটি পাশাপাশি ভবন রয়েছে, সেগুলোকে একীভূত করে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বানানোর একটি বিষয় আলোচনায় ছিল। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের জটিলতার কারণে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি এখন কিছুটা কমিয়ে আনার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এই তথ্যগুলো গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্র থেকে পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, পরিকল্পনা ছিল স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ভবন দুটির মধ্যে যাতায়াতের সুবিধার জন্য শুধু দুই স্তরবিশিষ্ট একটি করিডোর তৈরি করলেই সেটি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হয়ে যাবে। এমন পরিকল্পনা থেকেই গৃহায়ন ও গণপূর্তসচিব নজরুল ইসলাম, সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা, প্রধান উপদেষ্টার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসান এবং এসএসএফ মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুব উস সামাদসহ একটি প্রতিনিধি দল ভবন দুটি পরিদর্শন করেন। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও একাধিকবার পুরো এলাকা ঘুরে দেখেছেন। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে আপাতত এই উদ্যোগ থেকে সরে আসার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারের এই উদ্যোগের কথা জানাজানি হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে যে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাড়ি দুটিকে যদি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বানানোই হয়, তাহলে নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার থাকবেন কোথায়? সরকার এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না? শুধু তাই নয়, নতুন বাড়িতে প্রধানমন্ত্রী থাকলেই তো হবে না, তার দপ্তরের সাথে যুক্ত কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীরাই বা কোথায় থাকবেন? তাদের জন্যও তো নতুন করে বাড়ি বানাতে হবে। সেই জায়গাই বা কোথায়? সংসদ ভবন এলাকায় নতুন করে কিছু বানালে লুই আই কানের নকশার কী হবে?

এরই মধ্যে এমন অভিযোগও উঠেছে যে, লুই আই কানের নকশা লঙ্ঘন করেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বর্তমান বাসভবন দুটি তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে, ১০ একর জমির ওপর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রটিও নির্মাণ করা হয়েছে।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাসভবন বানাতে হলে সে সংক্রান্ত একটি প্রকল্প নিতে হয়। এই প্রকল্পটি নিতে হবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বা জাতীয় সংসদ সচিবালয়কে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আবার অর্থ বরাদ্দও থাকতে হয়, যা অর্থ মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করে। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সরকারের যে মূল এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) নেওয়া হয়েছে, তাতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প রাখা হয়নি।

অন্যদিকে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্র থেকেও জানা গেছে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতে এমন কোনো প্রকল্প পাওয়া যায়নি। আবার জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এডিপিতেও এ সংক্রান্ত কোনো প্রকল্প নেই বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, এই ধরনের কোনো প্রকল্প বা সরকারি কর্মসূচির জন্য এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কোথায় হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার। এই বিষয়টি ঠিক করার দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের নয়। একইভাবে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটাও নতুন সরকারই ঠিক করবে।

এই বিষয়ে জানার জন্য গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলাম এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলার সাথে বাংলা ট্রিবিউন একাধিকবার ফোনে ও সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক অতিরিক্ত সচিব নাম না প্রকাশের শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা দেখভাল করছেন। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবও একই ধরনের কথা বলেছেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে গণভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে তিনি নিজে গণভবনে বসবাস করেননি। পরে এইচএম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে গণভবন সংস্কার করে এর নাম ‘করতোয়া’ রাখা হয় এবং এটিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হলে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তিনি ‘গণভবন’ নামটি পুনরায় চালু করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে সেখানে বসবাস শুরু করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অবশ্য প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে গণভবনে থাকেননি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর গণভবন সংস্কার করা হয়। ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় গণভবনে ওঠেন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত তিনি এই ভবনেই ছিলেন। তবে ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়, যার পর থেকে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে গণভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আর এর পর থেকেই প্রশ্ন ওঠে যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী তাহলে থাকবেন কোথায়?

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

জিম্বাবুয়েকে উড়িয়ে সেমিফাইনালের লড়াইয়ে টিকে রইল ভারত

সংসদ ভবন এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের উদ্যোগ থেকে সরকার কিছুটা সরে এসেছে

আপডেট সময় : ১১:২২:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২ নভেম্বর ২০২৫

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের জন্য বর্তমানে যে দুটি পাশাপাশি ভবন রয়েছে, সেগুলোকে একীভূত করে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বানানোর একটি বিষয় আলোচনায় ছিল। কিন্তু বিভিন্ন ধরনের জটিলতার কারণে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গতি এখন কিছুটা কমিয়ে আনার কৌশল নেওয়া হয়েছে। এই তথ্যগুলো গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্র থেকে পাওয়া গেছে।

জানা গেছে, পরিকল্পনা ছিল স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ভবন দুটির মধ্যে যাতায়াতের সুবিধার জন্য শুধু দুই স্তরবিশিষ্ট একটি করিডোর তৈরি করলেই সেটি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হয়ে যাবে। এমন পরিকল্পনা থেকেই গৃহায়ন ও গণপূর্তসচিব নজরুল ইসলাম, সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা, প্রধান উপদেষ্টার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল ফেরদৌস হাসান এবং এসএসএফ মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুব উস সামাদসহ একটি প্রতিনিধি দল ভবন দুটি পরিদর্শন করেন। এছাড়া নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও একাধিকবার পুরো এলাকা ঘুরে দেখেছেন। কিন্তু নানা জটিলতার কারণে আপাতত এই উদ্যোগ থেকে সরে আসার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, সরকারের এই উদ্যোগের কথা জানাজানি হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে যে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাড়ি দুটিকে যদি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বানানোই হয়, তাহলে নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার থাকবেন কোথায়? সরকার এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না? শুধু তাই নয়, নতুন বাড়িতে প্রধানমন্ত্রী থাকলেই তো হবে না, তার দপ্তরের সাথে যুক্ত কর্মকর্তা ও নিরাপত্তাকর্মীরাই বা কোথায় থাকবেন? তাদের জন্যও তো নতুন করে বাড়ি বানাতে হবে। সেই জায়গাই বা কোথায়? সংসদ ভবন এলাকায় নতুন করে কিছু বানালে লুই আই কানের নকশার কী হবে?

এরই মধ্যে এমন অভিযোগও উঠেছে যে, লুই আই কানের নকশা লঙ্ঘন করেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বর্তমান বাসভবন দুটি তৈরি করা হয়েছে। একইভাবে, ১০ একর জমির ওপর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্রটিও নির্মাণ করা হয়েছে।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর জন্য বাসভবন বানাতে হলে সে সংক্রান্ত একটি প্রকল্প নিতে হয়। এই প্রকল্পটি নিতে হবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় বা জাতীয় সংসদ সচিবালয়কে। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আবার অর্থ বরাদ্দও থাকতে হয়, যা অর্থ মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করে। কিন্তু পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য সরকারের যে মূল এডিপি (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) নেওয়া হয়েছে, তাতে এ ধরনের কোনো প্রকল্প রাখা হয়নি।

অন্যদিকে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও জাতীয় সংসদ সচিবালয় সূত্র থেকেও জানা গেছে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এডিপিতে এমন কোনো প্রকল্প পাওয়া যায়নি। আবার জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের এডিপিতেও এ সংক্রান্ত কোনো প্রকল্প নেই বলে জানা গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, এই ধরনের কোনো প্রকল্প বা সরকারি কর্মসূচির জন্য এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কোথায় হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেবে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকার। এই বিষয়টি ঠিক করার দায়িত্ব অন্তর্বর্তী সরকারের নয়। একইভাবে, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটাও নতুন সরকারই ঠিক করবে।

এই বিষয়ে জানার জন্য গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলাম এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলার সাথে বাংলা ট্রিবিউন একাধিকবার ফোনে ও সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একাধিক অতিরিক্ত সচিব নাম না প্রকাশের শর্তে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা দেখভাল করছেন। এর সঙ্গে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।’ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবও একই ধরনের কথা বলেছেন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে গণভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে তিনি নিজে গণভবনে বসবাস করেননি। পরে এইচএম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে গণভবন সংস্কার করে এর নাম ‘করতোয়া’ রাখা হয় এবং এটিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হলে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। তখন তিনি ‘গণভবন’ নামটি পুনরায় চালু করে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে সেখানে বসবাস শুরু করেন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অবশ্য প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে গণভবনে থাকেননি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর গণভবন সংস্কার করা হয়। ২০১০ সালের মার্চে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুনরায় গণভবনে ওঠেন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত তিনি এই ভবনেই ছিলেন। তবে ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতা গণভবনে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়, যার পর থেকে এটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে গণভবনকে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ বানানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আর এর পর থেকেই প্রশ্ন ওঠে যে, নতুন প্রধানমন্ত্রী তাহলে থাকবেন কোথায়?