গত সোমবার যশোরে এক বিশাল জনসভায় বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনে বলেছেন, দলটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও নিজস্ব অ্যাকাউন্টে জামায়াত আমিরের নারীবিদ্বেষী বক্তব্য তাদেরই এবং এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ দিয়েছেন। তারেক রহমান জামায়াতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, যারা নির্বাচনের আগে জনগণের সঙ্গে মিথ্যা কথা বলতে পারে, তারা নির্বাচনের পরে কী পরিমাণ মিথ্যা কথা বলতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।
যশোর সদর উপজেলার উপশহর কলেজ মাঠে আয়োজিত জনসভায় তারেক রহমান বলেন, “আপনারা জাতির সামনে বলছেন আপনাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়ে গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা প্রমাণ করেছেন আপনাদের হ্যাক-ম্যাক কিছুই হয়নি। বাঁচার জন্য আপনারা মিথ্যা কথা বলছেন।”
বিএনপি চেয়ারপারসন অভিযোগ করেন, জামায়াতে ইসলামী দেশের নারীদের ঘরের মধ্যে আটকে রাখতে চায়। সে কারণেই দলটির সবচেয়ে বড় নেতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নারীদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন এবং নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অ্যাকাউন্টে লক্ষ-কোটি কর্মজীবী মা-বোনদের নিয়ে কুরুচিপূর্ণ কথা বলেছেন।
তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, জামায়াতের নারী কর্মীরাও তো ঘর থেকে বের হয়ে তাদের দলের কাজে যায়। তাহলে কি এখন প্রশ্ন করা যায় না যে, তাদের দলের নেতা তাদের সম্পর্কে কী নোংরা চিন্তা করেন? তারেক রহমান বলেন, এখন তারাই আবার নিজেদের নারী কর্মীদের গ্রামে গ্রামে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে তাদের এনআইডি নম্বর আর বিকাশ নম্বর নেওয়ার জন্য, হয়তো কাউকে কিছু টাকা বিকাশ করেও দেবে, কিন্তু এরপর আর তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।
তারেক রহমান ইসলামের ইতিহাস টেনে বলেন, আমাদের প্রিয় নবী করিম (স.) এর স্ত্রী বিবি খাদিজা ছিলেন একজন ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী নারী। বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের বাহিনীর লোক-লস্কর, সরঞ্জাম ও যুদ্ধের খাবার-দাবার সকল কিছুর আয়োজন করেছিলেন হজরত খাদিজা (রা.)। শুধু তাই নয়, আহত সৈনিকদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও হজরত আয়েশার (রা.) মাধ্যমে হয়েছিল, যা বর্তমান নার্সিং সিস্টেমের ভিত্তি।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা নিজেদের দেশের মানুষকে এভাবে আপত্তিকর বিশেষণে বিশেষায়িত করে তাদের কাছ থেকে জনগণ কি ভালো কিছু আশা করতে পারে? তাদের কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব নয়।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারে থাকাকালে বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষা ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত ফ্রি করে দিয়েছিলেন উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারলে সকল মায়েদের কাছে, সকল গৃহিণীর কাছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রত্যেকটি পরিবারের ন্যূনতম একজন মা বা গৃহিণী সরকারের কাছ থেকে সুযোগ পাবেন। তিনি বিশ্বাস করেন, পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারলেই একমাত্র বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীকে পেছনে রেখে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারবে- এটা আমরা আশা করতে পারি না। বাংলাদেশ তখনই উন্নতি করতে পারবে যখন নারী-পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসাথে কাজ করতে পারবো।
তারেক রহমান জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেন, তারা এখন ষড়যন্ত্র শুরু করেছে কীভাবে নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করা যায়। তারা তাদের লোকজনকে মা-বোনদের কাছে পাঠাচ্ছে এনআইডি নম্বর ও বিকাশ নম্বর নেওয়ার জন্য। তিনি প্রশ্ন করেন, “তারা বলেন, তারা সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন। আরে ভাই, আপনাদের এই প্রস্তাবটাই তো সবথেকে বড় অসৎ প্রস্তাব। আপনারা অসৎ কাজ শুরু করে কীভাবে মনে করেন যে, সৎ লোকের শাসন কায়েম করবেন?”
নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য এবং ভোট গণনা দীর্ঘায়িত করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও তিনি জনগণকে সতর্ক থাকতে বলেন। তিনি বলেন, “এবার নাকি ভোট গণনা করতে অনেক সময় লাগবে। এদেশের মানুষ হয়তো এক যুগ ভোট দিতে পারেনি, কিন্তু ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের একেবারে যে নাই তা না। এদেশের মানুষ একানব্বই, ছিয়ানব্বই, ২০০১ সালে ভোট দিয়েছে। ভোট গণনা করতে কেমন সময় লাগে বাংলাদেশের মানুষের সেই ধারণা আছে। কাজেই যদি কেউ ভোট গণনা করতে দেরি হবে উছিলাতে সুযোগ নিতে চায় তাহলে আপনাদেরকে তা প্রতিরোধ করতে হবে।”
জনসভায় তারেক রহমান জনতার রায়ে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে পারলে কৃষকদের দশ হাজার টাকার কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ এবং ‘কৃষিকার্ডের’ মাধ্যমে সার, বীজসহ যাবতীয় কৃষি উপকরণ ও স্বল্প-সুদে কৃষিঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। যুবক-যুবতীদের দক্ষ করে তুলতে আইটি পার্ক স্থাপনসহ দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের একাধিক বিকল্প গড়ে তোলার কথা বলেন। তিনি আখ চাষ বৃদ্ধি ও বন্ধ চিনিকল খুলে দেওয়া, এবং যশোরের ফুল বিদেশে রপ্তানির জন্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানেরও ঘোষণা দেন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উলাশী খাল খনন কর্মসূচির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, বিএনপি আবার ক্ষমতায় গেলে উলাশী খাল পুনরায় খননসহ দেশে হাজার হাজার খাল খনন করে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাবে এবং ‘জিকে প্রকল্প’ সচল করবে।
ইমাম, মুয়াজ্জিনসহ সকল ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্য সম্মানী ভাতা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এই ভাতা প্রদান করা হবে, যাতে তারা সম্মানের সাথে জীবন অতিবাহিত করতে পারেন। তিনি মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিক মানুষের অংশগ্রহণের উল্লেখ করে বলেন, “এই দেশ যেমন মুসলমানের, তেমনি হিন্দু, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মের মানুষের। আমরা সকল ধর্মের মানুষই একতাবদ্ধ হয়ে একাত্তরে দেশ স্বাধীন করেছি, স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। আবার সবাই একতাবদ্ধ হয়েই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারবো ইনশাআল্লাহ।”
জনসভার শেষাংশে তারেক রহমান যশোরের ছয়টি আসনসহ বৃহত্তর যশোর-কুষ্টিয়ার ২২টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “আজকে যারা ধানের শীষ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তাদেরকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেখে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। তারা যাতে সংসদে যেতে পারে সেজন্য আপনাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা রাখতে হবে এবং ভোট দিতে হবে। নির্বাচিত হতে পারলে এসব নেতা ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের দায়িত্ব নেবেন। আপনার এলাকা ও দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব নেবেন।”
এর আগে গত সোমবার দুপুরে খুলনার জনসভা শেষে হেলিকপ্টারযোগে তারেক রহমান যশোর শহরতলীর বিরামপুর স্কুলমাঠে নির্মিত হেলিপ্যাডে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে নামেন। সেখান থেকে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা গাড়িতে চড়ে উপশহর কলেজ মাঠের জনসভামঞ্চে পৌঁছান ২টা ৩০ মিনিটে। দুপুর ২টা ৩৯ মিনিটে শুরু হয়ে তার বক্তব্য চলে ৩৩ মিনিট ধরে। জনসভামঞ্চ থেকে নেমে তারেক রহমান গণঅভ্যুত্থানে কয়েক শহীদের পরিবারের সাথেও সাক্ষাৎ করেন।
যশোর জেলা বিএনপি সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকনের সঞ্চালনায় জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, কেন্দ্রীয় নেতা নিতাই রায় চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কেন্দ্রীয় সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু, আমিরুজ্জামান খান শিমুল, কুষ্টিয়ার জাকির হোসেন সরদার, নড়াইলের বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মেহেরপুরের জাভেদ মাসুদ মিল্টন এবং যশোরের মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু।
রিপোর্টারের নাম 























