দীর্ঘ এক যুগের অপেক্ষা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে আজ (সোমবার) চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন (সিইআইজেড)-এর। বাংলাদেশ ও চীনের সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পকে দেশের শিল্পায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সরকার, ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা।
প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ এবং এক লাখের বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্প দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে। কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে আনোয়ারাকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শিল্প ও লজিস্টিক হাবে পরিণত করার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন।
অনুষ্ঠানে প্রকল্পের অডিও-ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা, সাব-লিজ চুক্তি স্বাক্ষর, সিইআইজেডের স্লোগান উন্মোচন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিসের উদ্বোধন, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীরে আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠছে এই অর্থনৈতিক অঞ্চল। প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা চীনের প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণ থেকে এবং ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে ব্যয় হবে।
প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সহায়ক অবকাঠামো প্রকল্পের আওতায় নির্মাণ করা হবে ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, ৩৩০ মিটার দীর্ঘ সেতু, ১ হাজার ১৮১ মিটার চার লেনের সড়ক, ২৫ এমএলডি ক্ষমতার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, গ্যাস সঞ্চালন সুবিধা, বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ও সঞ্চালন লাইন, পানি সংরক্ষণাগার, সলিড ওয়েস্ট ব্যবস্থাপনা সুবিধা এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর।
চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (সিসিসিআই) সভাপতি আমিরুল হক বলেন, চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত এই অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে আরও শক্তিশালী করবে। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) পরিচালক এস এম আবু তৈয়ব বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় ধরনের সুফল বয়ে আনবে। বর্তমানে চীন থেকে কাপড়, অ্যাকসেসরিজ ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করতে হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় ও পণ্য সরবরাহের সময় বেড়ে যায়। ভবিষ্যতে চীনা উৎপাদনকারীরা যদি আনোয়ারার এই অঞ্চল থেকেই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও উপকরণ সরবরাহ করেন, তাহলে সময় ও অর্থ—উভয়ই সাশ্রয় হবে এবং দেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও বাড়বে।
বেজার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে উন্নত টেক্সটাইল, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, কেমিক্যাল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পে চীনা বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি দেশীয় এবং অন্যান্য বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বেজার নির্বাহী সদস্য (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মেজর জেনারেল (অব.) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি ২০৩১ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। বাস্তবায়নের সময়কাল পাঁচ বছর হলেও প্রথম তিন বছরের মধ্যেই অন্তত ৬০ শতাংশ শিল্প প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গত ২২ থেকে ২৬ জুনের সরকারি চীন সফরের পর প্রকল্পটির বাস্তবায়নে নতুন গতি আসে। ওই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ২৫ জুন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন (সিআরবিসি)-এর মধ্যে ডেভেলপার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, দীর্ঘদিন বিলম্বিত এই প্রকল্পে এখন দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। নতুন সরকারের মেয়াদের প্রথম চার মাসের মধ্যেই প্রয়োজনীয় প্রায় সব নথিপত্রের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি চীনা কোম্পানি প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
রাষ্ট্রদূত আরও বলেন, বেইজিং ও ডালিয়ানে প্রধানমন্ত্রী এবং শীর্ষস্থানীয় চীনা কোম্পানিগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ যে চীনা বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত, সিইআইজেডের অগ্রগতি সেই বার্তাই বহন করছে।
চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, চাইনিজ ইকোনমিক জোন এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। এটি বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ব্যাপক উন্নয়ন হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, স্থানীয় তরুণদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, কর্ণফুলী টানেল, সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় আনোয়ারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এলাকা। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহার বাড়বে, পাশাপাশি দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে।
বাংলাদেশ ও চীন ২০১৪ সালে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় প্রকল্পটি নতুন মাত্রা পায় এবং একই বছর জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়। তবে ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন চূড়ান্তকরণ ও প্রশাসনিক জটিলতায় প্রায় এক দশকের বেশি সময় প্রকল্পটি স্থবির ছিল।
প্রথমদিকে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির (সিএইচইসি) নাম আলোচনায় থাকলেও পরে ২০২২ সালে চীন সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) ডেভেলপার হিসেবে মনোনয়ন দেয়। এরপর ধাপে ধাপে জটিলতা কাটিয়ে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে এই মেগা শিল্পাঞ্চলের নির্মাণযাত্রা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই অর্থনৈতিক অঞ্চল ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হবে। এর মাধ্যমে শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রাম নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও যুক্ত হবে নতুন গতির সঞ্চার।
রিপোর্টারের নাম 
























