ঢাকা ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

গাইবান্ধা-৫ আসনে চরাঞ্চলের উন্নয়নই নির্ধারণ করবে জয়-পরাজয়

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:৫৪:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে দেখা দিয়েছে চরাঞ্চলের ভোটাররা। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবিধৌত এই দুই উপজেলার আটটি চর এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই আসনটির নির্বাচনী রাজনীতি বরাবরই নদীভাঙন এবং চরাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে আসছে। তাই, যে প্রার্থী নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং চর এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন, ভোটাররা তাদের দিকেই ঝুঁকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি মূলত নদীমাতৃক। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর করাল গ্রাসে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাটবাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে অসংখ্য মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সামর্থ্যবানরা অন্য এলাকায় বসত গড়তে পারলেও, অনেককেই অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। তাদের সারা বছরই কাটে বাস্তুভিটা হারানোর আশঙ্কায়।

চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এবারও তারা এমন প্রার্থী খুঁজছেন যিনি নির্বাচিত হয়ে এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী ও কার্যকর সমাধানে কাজ করবেন। তাদের মতে, নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা এলাকায় আসেন, ভোট চান, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা ভুলে যান।

বিস্তীর্ণ বালুচরে বর্তমানে কৃষিতে একধরনের বিপ্লব ঘটেছে। ছোট-বড় অর্ধশতাধিক চরে বছরে প্রায় দুই লক্ষ টনের বেশি বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। কিন্তু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নিয়ে যাওয়া এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়া চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। হলদিয়া এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে আমরা আমাদের কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নিয়ে যেতে পারি না। এলাকার আশেপাশে কোনো হিমাগারও নেই।” একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান শাজাহান আলী নামের আরেক কৃষক।

স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও প্রায় একই রকম। কোনো চরেই উন্নতমানের হাসপাতাল নেই। অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ভোগান্তি নিত্যদিনের ঘটনা, বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব প্রায়শই মাতৃমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

শিক্ষার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। ভাঙনের কবলে পড়ে বছরজুড়ে কয়েকবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর করতে হয়। এছাড়া, অধিকাংশ চরেই নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি, ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক। ব্রহ্মপুত্র নদের কিছু এলাকায় লোক দেখানো বাঁধ নির্মাণ হলেও, তা টেকসই না হওয়ায় প্রতি বছর ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদীশাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবেই বছরের পর বছর ধরে এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

ফুলছড়ি ইউনিয়নের মনোয়ার হোসেন ও মকসেদ আলী বলেন, “বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের আশ্রয়ে বসবাস করছি। আমাদের স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। আসন্ন নির্বাচনে চরের উন্নয়নে যে প্রার্থী কাজ করবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।” এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের আগলার চরের সাইদুর রহমান এবং ফজলুপুর ইউনিয়নের লালুমিয়ার চরের আসরাফ আলিও একই ধরনের কথা বলেন। হলদিয়ার চরের কৃষক মোজাম্মেল হক জানান, “আমাদের কোনো দল-মত নেই। চরকে নিয়ে যে প্রার্থী ভাববে, আমরা তাকেই সমর্থন দেব।”

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও চরাঞ্চল চষে বেড়াচ্ছেন এবং নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার নদী তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীকে অভিশাপে পরিণত না করে আশীর্বাদে পরিণত করার জন্য স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলেছেন। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি চরাঞ্চলে পশুপালন কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত টানেল বা সেতু নির্মাণ, ট্যানারি ও জুট মিল স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, নদীভাঙন রোধ, চরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন এবং নিরাপদ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিই এই আসনে ভোটারদের মন জয় করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাজ্যে মার্কিন বি-১ বোমারু বিমানের নতুন সমাবেশ: প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি জোরদার

গাইবান্ধা-৫ আসনে চরাঞ্চলের উন্নয়নই নির্ধারণ করবে জয়-পরাজয়

আপডেট সময় : ০৩:৫৪:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে দেখা দিয়েছে চরাঞ্চলের ভোটাররা। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীবিধৌত এই দুই উপজেলার আটটি চর এলাকার মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, নদী ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই আসনটির নির্বাচনী রাজনীতি বরাবরই নদীভাঙন এবং চরাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়ে আসছে। তাই, যে প্রার্থী নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং চর এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিতে পারবেন, ভোটাররা তাদের দিকেই ঝুঁকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনটি মূলত নদীমাতৃক। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে প্রমত্ত ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর করাল গ্রাসে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি, বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাটবাজার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে অসংখ্য মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়েন। সামর্থ্যবানরা অন্য এলাকায় বসত গড়তে পারলেও, অনেককেই অন্যের জমিতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। তাদের সারা বছরই কাটে বাস্তুভিটা হারানোর আশঙ্কায়।

চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এবারও তারা এমন প্রার্থী খুঁজছেন যিনি নির্বাচিত হয়ে এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী ও কার্যকর সমাধানে কাজ করবেন। তাদের মতে, নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা এলাকায় আসেন, ভোট চান, কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর চরাঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা ভুলে যান।

বিস্তীর্ণ বালুচরে বর্তমানে কৃষিতে একধরনের বিপ্লব ঘটেছে। ছোট-বড় অর্ধশতাধিক চরে বছরে প্রায় দুই লক্ষ টনের বেশি বিভিন্ন ফসল উৎপাদিত হয়। কিন্তু উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে নিয়ে যাওয়া এবং ন্যায্যমূল্য পাওয়া চরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। হলদিয়া এলাকার কৃষক সাইফুল ইসলাম বলেন, “ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে আমরা আমাদের কৃষিপণ্য সময়মতো বাজারে নিয়ে যেতে পারি না। এলাকার আশেপাশে কোনো হিমাগারও নেই।” একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান শাজাহান আলী নামের আরেক কৃষক।

স্বাস্থ্যসেবার চিত্রও প্রায় একই রকম। কোনো চরেই উন্নতমানের হাসপাতাল নেই। অসুস্থ রোগীকে নিয়ে ভোগান্তি নিত্যদিনের ঘটনা, বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। স্বাস্থ্য সচেতনতা ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার অভাব প্রায়শই মাতৃমৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

শিক্ষার অবস্থাও আশঙ্কাজনক। ভাঙনের কবলে পড়ে বছরজুড়ে কয়েকবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো স্থানান্তর করতে হয়। এছাড়া, অধিকাংশ চরেই নেই কোনো পুলিশ ফাঁড়ি, ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নাজুক। ব্রহ্মপুত্র নদের কিছু এলাকায় লোক দেখানো বাঁধ নির্মাণ হলেও, তা টেকসই না হওয়ায় প্রতি বছর ভয়াবহ ভাঙন দেখা দেয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদীশাসনের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবেই বছরের পর বছর ধরে এই দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

ফুলছড়ি ইউনিয়নের মনোয়ার হোসেন ও মকসেদ আলী বলেন, “বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারিয়ে অন্যের আশ্রয়ে বসবাস করছি। আমাদের স্থায়ী কোনো ঠিকানা নেই। আসন্ন নির্বাচনে চরের উন্নয়নে যে প্রার্থী কাজ করবে, আমরা তাকেই ভোট দেব।” এরেন্ডাবাড়ি ইউনিয়নের আগলার চরের সাইদুর রহমান এবং ফজলুপুর ইউনিয়নের লালুমিয়ার চরের আসরাফ আলিও একই ধরনের কথা বলেন। হলদিয়ার চরের কৃষক মোজাম্মেল হক জানান, “আমাদের কোনো দল-মত নেই। চরকে নিয়ে যে প্রার্থী ভাববে, আমরা তাকেই সমর্থন দেব।”

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও চরাঞ্চল চষে বেড়াচ্ছেন এবং নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফারুক আলম সরকার নদী তীর সংরক্ষণের মাধ্যমে নদীকে অভিশাপে পরিণত না করে আশীর্বাদে পরিণত করার জন্য স্থায়ী প্রকল্প গ্রহণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ ও পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কথা বলেছেন। জামায়াত মনোনীত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ নদীভাঙন রোধের পাশাপাশি চরাঞ্চলে পশুপালন কেন্দ্র, পুলিশ ফাঁড়ি, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বালাসী থেকে জামালপুরের বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত টানেল বা সেতু নির্মাণ, ট্যানারি ও জুট মিল স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করার পরিকল্পনা জানিয়েছেন।

সব মিলিয়ে, নদীভাঙন রোধ, চরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন এবং নিরাপদ জীবনযাত্রা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিই এই আসনে ভোটারদের মন জয় করার প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।