বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনপদ এবং ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে খ্যাত নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর ও বন্দর) আসনে বইছে নির্বাচনী হাওয়া। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই আসনে ১০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ভোটের মাঠের সমীকরণ বলছে, লড়াই হবে মূলত ত্রিমুখী। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, দিচ্ছেন উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার আড্ডায় এখন প্রধান আলোচনার বিষয়—কার গলায় উঠবে জয়ের মালা।
নির্বাচনী এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছোটখাটো কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এখন পর্যন্ত প্রচার-প্রচারণার পরিবেশ বেশ সন্তোষজনক। পুরুষ কর্মীদের পাশাপাশি নারী সমর্থকদের সরব উপস্থিতিতে প্রচারণায় ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। তবে সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১০ জন প্রার্থীর মধ্যে ভোটের মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী, স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং দশ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যে।
এই আসনের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। পেশায় আইনজীবী আবুল কালাম ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। মহানগর বিএনপির সাবেক এই সভাপতির রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং পারিবারিক ঐতিহ্য। প্রতিটি ওয়ার্ডে তার সুসংগঠিত কর্মী বাহিনী তাকে জয়ের দৌড়ে এগিয়ে রাখছে। তবে তার ছেলে ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু কাউসার আশার অনুসারীদের কিছু নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে কিছুটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে, যা ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই আসনে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী মাকসুদ হোসেন। সাবেক এই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ফুটবল প্রতীক নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। এক সময় জেলা জাতীয় পার্টির সহ-সভাপতি থাকলেও বর্তমানে তিনি স্বতন্ত্রভাবে লড়ছেন। বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সমর্থিত প্রার্থীকে পরাজিত করে তিনি নিজের রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। এর আগে একাধিকবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তৃণমূল পর্যায়ে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তার শক্তিশালী অবস্থান হেভিওয়েট প্রার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লড়াইয়ের তৃতীয় মেরুতে রয়েছেন ‘মোল্লা মামুন স্যার’ হিসেবে পরিচিত এবিএম সিরাজুল মামুন। পেশায় ইংরেজি শিক্ষক সিরাজুল মামুন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব। দশ দলীয় জোটের সমর্থনে দেওয়াল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। ধর্মীয় আদর্শভিত্তিক ভোটারদের পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবে তার নিজস্ব একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। গত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও তিনি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোট পেয়ে নিজের অবস্থান জানান দিয়েছিলেন। এবার জোটবদ্ধ সমর্থন পাওয়ায় তিনি জয় নিয়ে বেশ আশাবাদী।
নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে এখন পর্যন্ত নির্বাচনী পরিবেশ স্থিতিশীল রয়েছে। ভোটাররা বলছেন, তারা এমন একজন প্রতিনিধি চান যিনি এলাকার উন্নয়নে কাজ করবেন এবং সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকবেন। প্রচারণার শেষ মুহূর্তে প্রার্থীরা ভোটারদের মন জয়ে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞ রাজনীতি, জনপ্রিয় স্বতন্ত্র মুখ নাকি জোটের শক্তি—কে হাসবে শেষ হাসি, তা দেখতে এখন ভোটের দিনের অপেক্ষায় নারায়ণগঞ্জবাসী।
রিপোর্টারের নাম 























