বর্তমান বিশ্বে ‘শরিয়াহ’ শব্দটি একদিকে যেমন ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতীক, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বসহ অনেক মুসলিম সমাজেও এটি এক ধরনের অস্বস্তি ও ভয়ের সঞ্চার করে। মূলত দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা, ঔপনিবেশিক মানসিকতা এবং মিডিয়ার একপেশে উপস্থাপনার কারণে শরিয়াহর মূল সৌন্দর্য আজ ঢাকা পড়ে গেছে। অথচ শরিয়াহর প্রকৃত অর্থ হলো ন্যায়বিচার, মানবিকতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার একটি সুসংহত নৈতিক কাঠামো।
ইসলামি আইনতত্ত্ব অনুযায়ী, ‘শরিয়াহ’ কোনো বিচ্ছিন্ন দণ্ডবিধি বা কেবল শাস্তিকেন্দ্রিক ব্যবস্থা নয়। আরবি ‘শর’ শব্দ থেকে আগত এই পরিভাষার আভিধানিক অর্থ হলো ‘পানির ঘাটে পৌঁছানোর সহজ পথ’। অর্থাৎ, এটি এমন এক জীবনদর্শন যা মানুষকে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক ভারসাম্যের দিকে পরিচালিত করে। প্রখ্যাত ফকিহ ইমাম শাতিবীর মতে, শরিয়াহর মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা, কঠোরতা চাপিয়ে দেওয়া নয়।
শরিয়াহর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে: ইবাদাত (স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক), মু’আমালাত (সামাজিক ও অর্থনৈতিক লেনদেন) এবং আখলাক (নৈতিক আচরণ)। ইসলামি ঐতিহ্যে আইন কখনো নৈতিকতা থেকে আলাদা ছিল না; বরং আইন ছিল নৈতিকতা প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম। ফলে শরিয়াহকে কেবল রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ বা আদালতকেন্দ্রিক শাস্তি হিসেবে দেখা এর প্রকৃত তাৎপর্যকে খাটো করার শামিল।
আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্য বা ‘মাকাসিদ আল-শারিয়াহ’ সাতটি প্রধান স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো—জীবন রক্ষা, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও সুরক্ষা, বংশগতি ও পারিবারিক মর্যাদা রক্ষা, সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ। এই উদ্দেশ্যগুলোর দিকে তাকালে স্পষ্ট হয় যে, শরিয়াহর লক্ষ্য হলো একটি নিরাপদ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো সুরক্ষিত থাকবে।
বাস্তব জীবনে শরিয়াহর প্রতিফলন কেবল আদালতে নয়, বরং একজন ব্যবসায়ীর সততা, একজন চিকিৎসকের পেশাদারিত্ব, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং পরিবেশের প্রতি সংবেদনশীলতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দুর্ভাগ্যবশত, এই মানবিক দিকগুলো এড়িয়ে কেবল শাস্তির বিষয়টিকে সামনে আনায় এক ধরনের ‘ভীতি’ তৈরি হয়েছে। অথচ শরিয়াহর মূল সুর হলো—আইনের আবরণে নৈতিকতা এবং নৈতিকতার মাধ্যমে সমাজ সংস্কার।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার—আদতে ইসলামি শরিয়াহর মাকাসিদ বা উদ্দেশ্যগুলোরই প্রতিফলন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে যে বৈষম্যহীন ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার সাথে শরিয়াহর ন্যায়বিচারের দর্শনের গভীর মিল রয়েছে। তবে গত কয়েক দশকে ক্ষমতার রাজনীতির সাথে নৈতিক রাষ্ট্রদর্শনের বিচ্ছেদের কারণে এই আদর্শগুলো পূর্ণতা পায়নি।
শরিয়াহ নিয়ে বিদ্যমান ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে হলে শব্দটির প্রকৃত অর্থ ও মানবিক দিকগুলো সামনে আনা জরুরি। এটি কোনো ভয়ের বিষয় নয়, বরং ন্যায় ও কল্যাণের পথ। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, শরিয়াহর প্রয়োগে তাড়াহুড়ো বা উগ্রতার কোনো স্থান নেই। বরং সংলাপ, শিক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে এর সৌন্দর্য তুলে ধরা প্রয়োজন। চরমপন্থি বা রাজনৈতিক বিকৃতি থেকে শরিয়াহকে মুক্ত রাখা এখন সময়ের দাবি। যখন রাষ্ট্র ও সমাজে ন্যায়বিচার, সততা এবং মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হবে, তখনই শরিয়াহর প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে এবং অমূলক ভীতি দূর হয়ে মানুষের মনে আস্থার সৃষ্টি হবে।
রিপোর্টারের নাম 
























