ঢাকা ০১:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

নির্বাচনি প্রচারে নতুন মাত্রা: খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজপথে তারেক রহমান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনি প্রচারণায় বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য উচ্চতা তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে তাঁর সেই উত্তরাধিকার বহন করে রাজপথে সক্রিয় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলন, সংগ্রাম এবং সরকার পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচনি প্রচারে যে রেকর্ড গড়েছেন, তা আজও এ দেশের রাজনীতিতে এক বিস্ময়। বিশেষ করে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি নির্বাচনে তাঁর ক্লান্তিহীন প্রচারণা ও তৃণমূল সংযোগ আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৮০০টি জনসভা ও পথসভা করেছিলেন। একদিনে সর্বোচ্চ ৩৮টি জনসভায় বক্তব্য রাখার বিরল রেকর্ডও তাঁর দখলে। দলের ৩০০ প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নিতে তিনি টানা ৪৮ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর এই প্রচারশৈলী ও জনসম্পৃক্ততা আজও সমসাময়িক নেতাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে দেশব্যাপী নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন তারেক রহমান। ১/১১ পরবর্তী সময়ে কারাবরণ ও শারীরিক নির্যাতনের দীর্ঘ ধকল কাটিয়ে তিনি এখন অনেকটা সুস্থ। একটি বিশেষায়িত বাসে চড়ে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছেন। সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই প্রচারণায় তিনি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও বিভাগে ৩০টিরও বেশি জনসভায় অংশ নিয়েছেন।

তারেক রহমানের এবারের নির্বাচনি কৌশলে এসেছে আধুনিকতা ও ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি। গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তৃতার বাইরে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বা সংলাপের ওপর। জনসভায় সাধারণ মানুষকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা সরাসরি শুনছেন এবং ক্ষমতায় গেলে তার সমাধানের পথ বাতলে দিচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর ‘পলিসি টক’ বা নীতিনির্ধারণী আলোচনা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এতে বেকারত্ব দূরীকরণ, স্টুডেন্ট লোন এবং কৃষি আধুনিকায়নের মতো সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রযুক্তির ব্যবহারে তারেক রহমান এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পডকাস্ট, ফেসবুক রিল এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিশাল অনুসারী বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে তিনি আগামীর বাংলাদেশের ভিশন তুলে ধরছেন। এছাড়া কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং সাধারণ মানুষের জন্য ‘হেলথ কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি তাঁর প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আঞ্চলিক প্রচারণায় তিনি স্থানীয় সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। চট্টগ্রামে তিনি একে কার্যকর ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রথম ঘোষণা করেছিলেন। উত্তরবঙ্গে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সিলেটে রাস্তাঘাট মেরামত এবং ময়মনসিংহে মৎস্য ও আইটি খাতের প্রসারে তিনি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পেশ করেছেন। বিশেষ করে নিজ জেলা বগুড়ায় আবেগঘন বক্তৃতায় তিনি জেলাটিকে মডেল হিসেবে গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ঢাকার জনসভাগুলোতে তারেক রহমান ভোটারদের সতর্ক করে বলেছেন, স্বৈরাচারের পতন হলেও ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। তিনি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। ক্ষমতায় গেলে চার কোটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা, ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং নদী ও খালের নাব্য ফেরাতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি—যা তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিরই এক আধুনিক সংস্করণ।

পুরো প্রচারণায় তারেক রহমানের শিষ্টাচার ও বিনয় লক্ষ্য করার মতো। অতিরিক্ত ব্যানার-পোস্টার বা তোরণ নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে তিনি কর্মীদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে দেশ গঠনের নীতিভিত্তিক আলোচনাকেই তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তাঁর অবস্থান দলের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে তারেক রহমানের এই আধুনিক ও গণমুখী প্রচার কৌশল দেশের রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

নির্বাচনি প্রচারে নতুন মাত্রা: খালেদা জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজপথে তারেক রহমান

আপডেট সময় : ০৯:২৮:৩৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনি প্রচারণায় বেগম খালেদা জিয়া এক অনন্য উচ্চতা তৈরি করেছিলেন। বর্তমানে তাঁর সেই উত্তরাধিকার বহন করে রাজপথে সক্রিয় রয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া আন্দোলন, সংগ্রাম এবং সরকার পরিচালনার পাশাপাশি নির্বাচনি প্রচারে যে রেকর্ড গড়েছেন, তা আজও এ দেশের রাজনীতিতে এক বিস্ময়। বিশেষ করে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি নির্বাচনে তাঁর ক্লান্তিহীন প্রচারণা ও তৃণমূল সংযোগ আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রায় ১৮০০টি জনসভা ও পথসভা করেছিলেন। একদিনে সর্বোচ্চ ৩৮টি জনসভায় বক্তব্য রাখার বিরল রেকর্ডও তাঁর দখলে। দলের ৩০০ প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নিতে তিনি টানা ৪৮ ঘণ্টা না ঘুমিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর এই প্রচারশৈলী ও জনসম্পৃক্ততা আজও সমসাময়িক নেতাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বর্তমানে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান নিয়ে দেশব্যাপী নির্বাচনি প্রচারণা চালাচ্ছেন তারেক রহমান। ১/১১ পরবর্তী সময়ে কারাবরণ ও শারীরিক নির্যাতনের দীর্ঘ ধকল কাটিয়ে তিনি এখন অনেকটা সুস্থ। একটি বিশেষায়িত বাসে চড়ে তিনি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলছেন। সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই প্রচারণায় তিনি ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জেলা ও বিভাগে ৩০টিরও বেশি জনসভায় অংশ নিয়েছেন।

তারেক রহমানের এবারের নির্বাচনি কৌশলে এসেছে আধুনিকতা ও ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি। গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তৃতার বাইরে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বা সংলাপের ওপর। জনসভায় সাধারণ মানুষকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা সরাসরি শুনছেন এবং ক্ষমতায় গেলে তার সমাধানের পথ বাতলে দিচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে তাঁর ‘পলিসি টক’ বা নীতিনির্ধারণী আলোচনা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এতে বেকারত্ব দূরীকরণ, স্টুডেন্ট লোন এবং কৃষি আধুনিকায়নের মতো সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।

প্রযুক্তির ব্যবহারে তারেক রহমান এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পডকাস্ট, ফেসবুক রিল এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে তিনি সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর বিশাল অনুসারী বাহিনীকে কাজে লাগিয়ে তিনি আগামীর বাংলাদেশের ভিশন তুলে ধরছেন। এছাড়া কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং সাধারণ মানুষের জন্য ‘হেলথ কার্ড’ চালুর প্রতিশ্রুতি তাঁর প্রচারণায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

আঞ্চলিক প্রচারণায় তিনি স্থানীয় সমস্যাগুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। চট্টগ্রামে তিনি একে কার্যকর ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ হিসেবে গড়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা ১৯৯১ সালে খালেদা জিয়া প্রথম ঘোষণা করেছিলেন। উত্তরবঙ্গে কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, সিলেটে রাস্তাঘাট মেরামত এবং ময়মনসিংহে মৎস্য ও আইটি খাতের প্রসারে তিনি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা পেশ করেছেন। বিশেষ করে নিজ জেলা বগুড়ায় আবেগঘন বক্তৃতায় তিনি জেলাটিকে মডেল হিসেবে গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

ঢাকার জনসভাগুলোতে তারেক রহমান ভোটারদের সতর্ক করে বলেছেন, স্বৈরাচারের পতন হলেও ষড়যন্ত্র এখনো থেমে নেই। তিনি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। ক্ষমতায় গেলে চার কোটি পরিবারকে আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা, ৫ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং নদী ও খালের নাব্য ফেরাতে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি—যা তাঁর পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচিরই এক আধুনিক সংস্করণ।

পুরো প্রচারণায় তারেক রহমানের শিষ্টাচার ও বিনয় লক্ষ্য করার মতো। অতিরিক্ত ব্যানার-পোস্টার বা তোরণ নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে তিনি কর্মীদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না করে দেশ গঠনের নীতিভিত্তিক আলোচনাকেই তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফা এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে তাঁর অবস্থান দলের রাজনৈতিক লক্ষ্যকে আরও স্পষ্ট করেছে। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে তারেক রহমানের এই আধুনিক ও গণমুখী প্রচার কৌশল দেশের রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।