সারা দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হয়ে উঠলেও এর কোনো প্রভাব পড়েনি জামালপুরের বকশীগঞ্জের গারো পাহাড়ের জনপদে। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে উন্নয়নের সুফলবঞ্চিত এই প্রান্তিক জনপদের বাসিন্দাদের মধ্যে ভোট নিয়ে নেই কোনো উৎসাহ বা উদ্দীপনা। বরং বছরের পর বছর ধরে পাওয়া রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবতার বিস্তর ব্যবধানে ক্ষুব্ধ ও বিমুখ হয়ে পড়েছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এই মানুষগুলো।
ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুর ইউনিয়নে সাতানী পাড়া, সোমনাথ পাড়া, টিলা পাড়া, গারোমারা, দিঘলাকোনা, বৈষ্টমপাড়া ও বালুঝুড়ি—এই সাতটি পাহাড়ি গ্রামে গারো সম্প্রদায়ের বসবাস। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যেন এই জনপদে এখনো অধরা। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, সুপেয় পানির অভাব, ভঙ্গুর স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এখানকার মানুষের নিত্যসঙ্গী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা নানা আশার বাণী নিয়ে তাদের দোরগোড়ায় হাজির হন। কিন্তু জয়লাভের পর আর কেউ তাদের খবর রাখেন না। খগিস সাংমা নামের এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের জীবন এখনো আদিম যুগের মতোই রয়ে গেছে। যৎসামান্য যা উন্নয়ন হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। তাই ভোট নিয়ে আমাদের মধ্যে আর কোনো আগ্রহ নেই।”
ভৌগোলিক প্রতিকূলতার কারণে এক গ্রামের সাথে অন্য গ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি। বর্ষাকালে লালমাটির পাহাড়ি পথ কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে, যা স্থানীয়দের দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া কর্মসংস্থানের অভাব ও বন্য হাতির উপদ্রব এই জনপদের মানুষের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে। খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে আসা হাতির পাল প্রায়ই ফসল নষ্ট করছে এবং ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে নিয়মিত।
ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন, বকশীগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক কাপুস মারাক জানান, স্বাধীনতার পর থেকে একে একে ১২টি সংসদ নির্বাচন পার হলেও গারোদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। তিনি বলেন, “নির্বাচন এলে রাস্তাঘাট, স্কুল এবং ভূমির সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত। আমরাও এই দেশের নাগরিক, অথচ মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত। এখন আর আমরা প্রতিশ্রুতি চাই না, সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও বাস্তবায়ন চাই।”
নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা যখন শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে, তখন গারো পাহাড়ের এই নিভৃত পল্লীগুলোতে এখনো বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। চায়ের দোকানে বা আড্ডায় নেই কোনো নির্বাচনী আলাপ। প্রার্থীদের প্রতি একরাশ ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে দিন কাটছে এই জনপদের মানুষের। তাদের দাবি, এবার আর মুখের কথায় নয়, কাজের মাধ্যমেই প্রমাণ করতে হবে যে রাষ্ট্র তাদের প্রতি যত্নশীল। অন্যথায়, গণতন্ত্রের এই মহোৎসবে নিজেদের সম্পৃক্ত করার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাচ্ছেন না জামালপুরের এই অবহেলিত গারো সম্প্রদায়।
রিপোর্টারের নাম 

























