ঢাকা ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬

নৌকার সাবেক কাণ্ডারি এখন ধানের শীষের প্রচারে, বগুড়ায় রাজনৈতিক বিতর্ক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৭:০৮:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় এক চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একসময়ের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা, যিনি নৌকা প্রতীকের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন, এখন প্রকাশ্যে ধানের শীষ প্রতীকের হয়ে ভোট চাইছেন। এই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আলোচিত এই নেতা হলেন নিশিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলাম সরকার।

সহিদুল ইসলাম সরকার নিশিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি পারিবারিক ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, তবে পরবর্তীতে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীকের পক্ষে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপুর নৌকা প্রতীকের হয়ে একটি বিশেষভাবে আলোচিত নির্বাচনে তিনি প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এছাড়াও, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণসংযোগ ও ভোট প্রার্থনা করেন সহিদুল। জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি বগুড়া সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল ইসলাম রাজের পক্ষে প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের কাছে ভোট চান। তবে ওই নির্বাচনে রাজ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। পরবর্তীতে সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান শফিকের পক্ষে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে অংশ নেন। সে সময় শফিকের আনুকূল্যে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির পদও লাভ করেন। কিন্তু ওই নির্বাচনেও শফিক আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

কোটা আন্দোলন চলাকালে সহিদুল ইসলাম সরকার ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে গত ৫ আগস্ট ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং একটি মামলায় তিনি কারাবরণ করেন। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সহিদুল ইসলাম সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানে আকস্মিক পরিবর্তন আসে। এখন তিনি বগুড়া সদর-৬ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে গণসংযোগ করছেন। সম্প্রতি তারেক রহমানের একটি নির্বাচনি জনসভায় ব্যানার হাতে মিছিলে অংশ নেওয়ার তার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা নিয়ে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ছবিতে নিশিন্দারা ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি জাহেদুরকেও বিএনপির ব্যানারসহ মিছিলে দেখা গেছে, যা জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিয়েও স্থানীয় মহলে প্রশ্ন তুলেছে। এ বিষয়ে নিশিন্দারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাজিবুল করিম রাফি ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন মানিক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী সহিদুল এখন বিএনপির হয়ে ভোট চাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জুলাই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সুবিধাবাদিতা সাধারণ ভোটারদের মাঝে ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।” তারা আরও বলেন, “তিনি জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি, জেল খেটেছেন, আবার আওয়ামী লীগ আমলে প্রকাশ্যে ভোট করেছেন ও সব সুবিধা ভোগ করেছেন। একজন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার হাতে তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ধানের শীষের লিফলেট মাঠের ত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য অপমানজনক। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”

অভিযোগ প্রসঙ্গে সহিদুল ইসলাম সরকার তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থাকার কারণে তৎকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাকে অনেক কিছু করতে হয়েছে। তবে আমি মনেপ্রাণে বিএনপি করি।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “এগুলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।”

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ময়মনসিংহের ফুলপুরে সংস্কারের অভাবে বিধ্বস্ত সড়ক যোগাযোগ, জনদুর্ভোগ চরমে

নৌকার সাবেক কাণ্ডারি এখন ধানের শীষের প্রচারে, বগুড়ায় রাজনৈতিক বিতর্ক

আপডেট সময় : ০৭:০৮:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় এক চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক ঘটনা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। একসময়ের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা, যিনি নৌকা প্রতীকের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছেন, এখন প্রকাশ্যে ধানের শীষ প্রতীকের হয়ে ভোট চাইছেন। এই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আলোচিত এই নেতা হলেন নিশিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলাম সরকার।

সহিদুল ইসলাম সরকার নিশিন্দারা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি পারিবারিক ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, তবে পরবর্তীতে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপরও তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি নৌকা প্রতীকের পক্ষে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। বিশেষ করে, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপুর নৌকা প্রতীকের হয়ে একটি বিশেষভাবে আলোচিত নির্বাচনে তিনি প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এছাড়াও, জেলা পরিষদ ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে ইউনিয়ন পর্যায়ে গণসংযোগ ও ভোট প্রার্থনা করেন সহিদুল। জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি বগুড়া সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুল ইসলাম রাজের পক্ষে প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের কাছে ভোট চান। তবে ওই নির্বাচনে রাজ আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। পরবর্তীতে সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান আবু সুফিয়ান শফিকের পক্ষে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে অংশ নেন। সে সময় শফিকের আনুকূল্যে তিনি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির পদও লাভ করেন। কিন্তু ওই নির্বাচনেও শফিক আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।

কোটা আন্দোলন চলাকালে সহিদুল ইসলাম সরকার ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে গত ৫ আগস্ট ‘জুলাই বিপ্লবের’ পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। এ সময় তার বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় একাধিক মামলা দায়ের হয় এবং একটি মামলায় তিনি কারাবরণ করেন। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন।

জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর সহিদুল ইসলাম সরকারের রাজনৈতিক অবস্থানে আকস্মিক পরিবর্তন আসে। এখন তিনি বগুড়া সদর-৬ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট চেয়ে গণসংযোগ করছেন। সম্প্রতি তারেক রহমানের একটি নির্বাচনি জনসভায় ব্যানার হাতে মিছিলে অংশ নেওয়ার তার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়, যা নিয়ে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ভাইরাল হওয়া ছবিতে নিশিন্দারা ইউনিয়ন জাতীয় পার্টির সভাপতি জাহেদুরকেও বিএনপির ব্যানারসহ মিছিলে দেখা গেছে, যা জাতীয় পার্টির রাজনীতি নিয়েও স্থানীয় মহলে প্রশ্ন তুলেছে। এ বিষয়ে নিশিন্দারা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি রাজিবুল করিম রাফি ও সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন মানিক তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাভোগী সহিদুল এখন বিএনপির হয়ে ভোট চাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। জুলাই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন সুবিধাবাদিতা সাধারণ ভোটারদের মাঝে ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।” তারা আরও বলেন, “তিনি জুলাই মামলার এজাহারভুক্ত আসামি, জেল খেটেছেন, আবার আওয়ামী লীগ আমলে প্রকাশ্যে ভোট করেছেন ও সব সুবিধা ভোগ করেছেন। একজন সাবেক আওয়ামী লীগ নেতার হাতে তারেক রহমানের ছবি সম্বলিত ধানের শীষের লিফলেট মাঠের ত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য অপমানজনক। এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”

অভিযোগ প্রসঙ্গে সহিদুল ইসলাম সরকার তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে বলেন, “ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান থাকার কারণে তৎকালীন পরিবেশ ও পরিস্থিতি সামাল দিতে আমাকে অনেক কিছু করতে হয়েছে। তবে আমি মনেপ্রাণে বিএনপি করি।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ছবিগুলো প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “এগুলো এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।”