ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA) চূড়ান্ত হওয়া বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে ইউরোপের ২৭টি দেশে ভারতের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়া ও সামুদ্রিক পণ্যসহ প্রায় ৯৯.৫ শতাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। বর্তমানে যেখানে ইউরোপে ভারতীয় পোশাকের ওপর ৯-১২ শতাংশ শুল্ক রয়েছে, ২০২৭ সাল নাগাদ তা শূন্যে নেমে আসবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, যা আমাদের বিদ্যমান শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা (EBA) কেড়ে নেবে।
১. অসম প্রতিযোগিতার মুখে বাংলাদেশ
ভারত ও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সক্ষমতার মধ্যে একটি বিশাল মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ভারত নিজস্ব তুলা, সুতা, কাপড় এমনকি টেক্সটাইল মেশিনারি উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। অন্যদিকে, বাংলাদেশকে তুলা ও মেশিনারিজের জন্য প্রায় পুরোটাই আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
র্যাপিডের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “ভারত যখন শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে, তখন নিজস্ব কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে তাদের সক্ষমতা অনেক বেড়ে যাবে। বাংলাদেশ ২০২৯ সাল পর্যন্ত ট্রানজিশন পিরিয়ডে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।”
২. বাজার হিস্যার বর্তমান চিত্র ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি
ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার, যেখানে আমাদের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশ যায়। ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, গত কয়েক বছর ধরে ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি ভারতের তুলনায় প্রায় ৪ গুণেরও বেশি।
| বছর | বাংলাদেশের রপ্তানি (কোটি ইউরো) | ভারতের রপ্তানি (কোটি ইউরো) |
| ২০২৩ | ১,৭৪৪ | ৪০৯ |
| ২০২৪ | ১,৮৩১ | ৪১৮ |
| ২০২৫ (জানুয়ারি-নভেম্বর) | ১,৮০৫ | ৪২৪ |
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, ২০২৭ সালে ভারতের এফটিএ এবং ২০২৯ সালে বাংলাদেশের শুল্ক সুবিধা শেষ হওয়ার পর এই চিত্রটি নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো যখন শূন্য শুল্ক সুবিধা পাবে, তখন বাংলাদেশকে প্রায় ১২.৫ শতাংশ শুল্ক গুনে রপ্তানি করতে হতে পারে।
৩. নেগোসিয়েশন দক্ষতা ও সরকারি উদ্যোগের অভাব
রপ্তানিকারকদের মতে, ভারত ২০ বছর ধরে আলোচনার পর এই চুক্তি সফল করেছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো ইউরোপের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে কোনো শক্তিশালী ‘নেগোসিয়েশন টিম’ বা দীর্ঘমেয়াদী রূপরেখা তৈরি করতে পারেনি। বিকেএমইএ-র নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে অদক্ষ কর্মকর্তাদের পরিবর্তে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে দল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
৪. সংকট উত্তরণে করণীয়
বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য:
- জিএসপি প্লাস (GSP+): এলডিসি উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করতে দ্রুত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে জিএসপি প্লাস নিয়ে জোরালো আলোচনা শুরু করা।
- মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (FTA): কেবল ইউরোপ নয়, বরং যুক্তরাজ্য, জাপান এবং কানাডার মতো প্রধান বাজারগুলোর সাথে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করা।
- কাঁচামালে সক্ষমতা বৃদ্ধি: দেশের টেক্সটাইল শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং তুলা আমদানির জটিলতা দূর করে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী করা।
- দক্ষ নেগোসিয়েশন টিম: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ফোরামে দরকষাকষির জন্য প্রয়োজনে বিদেশি বিশেষজ্ঞ নিয়োগ দেওয়া এবং স্থায়ী একটি বাণিজ্য সেল গঠন করা।
পরিশেষে, ভারত ও ভিয়েতনামের শুল্কমুক্ত সুবিধার বিপরীতে বাংলাদেশ যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে ২০২৯ সালের পর ইউরোপের বিশাল বাজারে বাংলাদেশের আধিপত্য ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। অর্জিত এই বাজার হারানো মানেই দেশের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনা।
রিপোর্টারের নাম 























