বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শুরুতেই মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জানুয়ারি মাসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এ মাসে গণপিটুনি বা মব ভায়োলেন্সের ঘটনা ডিসেম্বরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। জানুয়ারি মাসে ২৮টি গণপিটুনির ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২১ জন, যেখানে ডিসেম্বর মাসে ২৪টি ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ১০ জন।
এমএসএফ মনে করে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা মূলত বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। সংগঠনটি একে এক ধরনের ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
জানুয়ারির মানবাধিকার পরিস্থিতির মূল চিত্র:
নিচে এমএসএফ-এর প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত প্রধান তথ্যগুলো তুলে ধরা হলো:
| সূচক | ডিসেম্বর ২০২৫ | জানুয়ারি ২০২৬ | পরিবর্তন |
| গণপিটুনিতে নিহত | ১০ জন | ২১ জন | ১১০% বৃদ্ধি |
| অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার | ৪৮টি | ৫৭টি | ১৮.৭% বৃদ্ধি |
| কারা হেফাজতে মৃত্যু | ৯ জন | ১৫ জন | ৬৬.৬% বৃদ্ধি |
| সংখ্যালঘু নির্যাতন | ৪টি ঘটনা | ১৫টি ঘটনা | ২৭৫% বৃদ্ধি |
| রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত | ২৭ জন | ৫০৯ জন | বিশাল ব্যবধান |
রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতার ভয়াবহতা
প্রতিবেদনে জানুয়ারি মাসের নির্বাচনি সহিংসতাকে অন্যতম ‘ভয়াবহ মানবাধিকার সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪ জন নিহত এবং ৫০৯ জন আহত হয়েছেন। এমএসএফ-এর মতে, নির্বাচনি প্রক্রিয়া কার্যত প্রাণঘাতী সহিংসতার দিকে মোড় নিচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত।
গণমামলা ও আইনি স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। জানুয়ারিতে নাম উল্লেখ করা আসামির গড় সংখ্যা ৩০ থেকে বেড়ে ১২০ এবং অজ্ঞাতনামা আসামির সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ৩২০ হয়েছে। এমএসএফ বলছে, এই গণমামলার প্রবণতা আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সংখ্যালঘু নির্যাতন ও নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু
জানুয়ারিতে প্রতিমা ভাঙচুর ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ১৫টি ঘটনা ঘটেছে, যা ডিসেম্বরের তুলনায় অনেক বেশি। এটি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পুনরুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতাকে প্রতিফলিত করে। এ ছাড়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ২ জনের মৃত্যু এবং গোলাগুলিতে ১ জনের নিহতের ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, হেফাজতে নির্যাতন এখনো একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে।
সামগ্রিকভাবে, জানুয়ারি মাসে প্রায় প্রতিটি সূচকেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এমএসএফ-এর মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে বিচারহীনতার সংস্কৃতি জেঁকে বসছে। দেশের এই অস্থিতিশীল মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ না নিলে তা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের রূপ নিতে পারে।
রিপোর্টারের নাম 























