ঢাকা ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বনাম প্রতিহিংসার রাজনীতি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৫১:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

সব ঠিক থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি সাধারণ ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকবে না, বরং এটি ১৬ জুলাই ও ৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতার’ সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষার দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে। দীর্ঘ দেড় দশকের জগদ্দল একদলীয় শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাসিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শৃঙ্খল ভাঙতে এ দেশের ছাত্র-জনতা যে অকাতরে রক্ত দিয়েছে, সেই মহান আত্মত্যাগের সার্থকতা আজ এক অনিশ্চিত সুতোয় ঝুলে আছে। প্রশ্ন উঠেছে—একটি শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে কি আমরা নতুন বাংলাদেশের শক্ত ভিত্তি গড়তে পারব? নাকি আমাদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রকারান্তরে সেই পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথকেই প্রশস্ত করে দিচ্ছে? বর্তমান নির্বাচনী উত্তাপ ও মাঠপর্যায়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা সচেতন নাগরিক সমাজকে এক গভীর ও অন্ধকার উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান এবং অনস্বীকার্য শর্ত হলো ভয়হীন পরিবেশ। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোলে আমরা লক্ষ্য করছি সেই পুরনো আধিপত্যবাদী ও সংঘাতময় আচরণের নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারির বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠা চিত্র ফুটে ওঠে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মাত্র ৪৫ দিনে (১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি) সারাদেশে অন্তত ১৪৪টি বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ভোটের মূল লড়াই শুরু হওয়ার আগেই রাজনীতির মাঠ ৪ জন কর্মীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। বিশেষ করে শেরপুরের শ্রীবরদীতে যেভাবে এক রাজনৈতিক নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কদর্য রূপকেই প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিকে ‘ফ্রাইটেনিং সিচুয়েশন’ বা ভয়াবহ হিসেবে অভিহিত করেছে। যখন বৈশ্বিক গণমাধ্যম আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন বুঝতে হবে সংকটের গভীরতা কতখানি।

ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মধ্যকার ফাটলই হতে পারে ফ্যাসিবাদের ফেরার সবচেয়ে সহজ সুড়ঙ্গ। যে রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের বুলেট মোকাবিলা করেছিল, আজ ক্ষমতার অলীক মোহে তারা একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের পবিত্র রক্তের সাথে এক ধরনের চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। নেতাদের উসকানিমূলক ভাষা বা ‘হেইট স্পিচ’ আজ মাঠপর্যায়ের সাধারণ কর্মীদের বেপরোয়া ও সহিংস করে তুলছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এবং সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণিতে ঘাপটি মেরে আছে। তারা এই সুযোগেরই অপেক্ষায় আছে—কখন আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হব এবং তারা বিশ্বদরবারে ‘বাংলাদেশি গণতন্ত্র ব্যর্থ’ বলে চিৎকার করার সুযোগ পাবে। অভ্যন্তরীণ এই দুর্বলতাই বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের পথ সুগম করে।

বর্তমান নির্বাচনের এই অস্থিরতাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরির সুপরিকল্পিত নীল নকশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার। বর্তমান যুগে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠ বা ভিডিও হুবহু নকল করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে কোনো জনপ্রিয় নেতার নামে মিথ্যা ও উসকানিমূলক ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে জনপদে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া সম্ভব। এই প্রযুক্তিনির্ভর অপপ্রচার আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক নতুন ও অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনকে তাই কেবল মাঠের নিরাপত্তা নয়, বরং ভার্চুয়াল জগতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সাইবার প্রোপাগান্ডা রুখতে ব্যর্থ হলে আমাদের অর্জিত বিপ্লবের সুফল ডিজিটাল ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়তে পারে।

নির্বাচনকে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে এখন প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কার্যকরী ‘নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করতে হবে। প্রথমত, সংবেদনশীল নির্বাচনী অঞ্চলগুলোতে সেনাবাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি ও টহল জনমনে আস্থার সঞ্চার করবে, যা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা রুখতে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, সব ফ্যাসিবাদবিরোধী দলের মধ্যে একটি ‘রাজনৈতিক ঐক্য সনদ’ বা ‘নির্বাচনী আচরণবিধি’ থাকা আবশ্যক, যেখানে নেতাদের বক্তব্যে শালীনতা ও কর্মীদের আচরণে সংযম নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকবে। তৃতীয়ত, একটি বিশেষ ‘সাইবার টাস্কফোর্স’ গঠন করে এআই বা ডিপফেক ব্যবহার করে ছড়ানো গুজবগুলো দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে হবে। পরিশেষে, ভোট-পরবর্তী সহিংসতা রোধে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি নির্বাচনের পরেও অন্তত দুই সপ্তাহ বজায় রাখতে হবে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জয়-পরাজয় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং তা নির্ধারণ করবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র কেমন হবে। ক্ষমতার মোহ যদি আমাদের বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং আমরা নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষরণে লিপ্ত হই, তবে ইতিহাসের নিষ্ঠুর কাঠগড়ায় আমাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হতে হবে। ১৫ বছরের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে সুযোগ পেয়েছি, তা হেলায় হারানো হবে আত্মঘাতী। ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন রুখতে হলে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সৌহার্দ্য ও আদর্শিক ঐক্য বজায় রাখা এখন কোনো বিকল্প নয়, বরং একমাত্র পথ। নেতাদের মনে রাখতে হবে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল একটি ক্ষমতা বদলের পালা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের পরীক্ষা। অর্জিত বিপ্লবের ফসল যেন কোনো হায়েনার মুখে চলে না যায়, সেই শপথ হোক আজ প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের পাথেয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

গণঅভ্যুত্থানের চেতনা বনাম প্রতিহিংসার রাজনীতি

আপডেট সময় : ১২:৫১:২৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

সব ঠিক থাকলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি সাধারণ ক্যালেন্ডারের তারিখ হয়ে থাকবে না, বরং এটি ১৬ জুলাই ও ৫ আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতার’ সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষার দিন হিসেবে চিহ্নিত হবে। দীর্ঘ দেড় দশকের জগদ্দল একদলীয় শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক ফ্যাসিবাদ এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শৃঙ্খল ভাঙতে এ দেশের ছাত্র-জনতা যে অকাতরে রক্ত দিয়েছে, সেই মহান আত্মত্যাগের সার্থকতা আজ এক অনিশ্চিত সুতোয় ঝুলে আছে। প্রশ্ন উঠেছে—একটি শান্তিপূর্ণ, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে কি আমরা নতুন বাংলাদেশের শক্ত ভিত্তি গড়তে পারব? নাকি আমাদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও প্রতিহিংসার রাজনীতি প্রকারান্তরে সেই পরাজিত ফ্যাসিস্ট শক্তির প্রত্যাবর্তনের পথকেই প্রশস্ত করে দিচ্ছে? বর্তমান নির্বাচনী উত্তাপ ও মাঠপর্যায়ের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা সচেতন নাগরিক সমাজকে এক গভীর ও অন্ধকার উদ্বেগের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রধান এবং অনস্বীকার্য শর্ত হলো ভয়হীন পরিবেশ। কিন্তু বর্তমান নির্বাচনী প্রচারণার ডামাডোলে আমরা লক্ষ্য করছি সেই পুরনো আধিপত্যবাদী ও সংঘাতময় আচরণের নির্লজ্জ পুনরাবৃত্তি। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারির বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে এক শিউরে ওঠা চিত্র ফুটে ওঠে। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর মাত্র ৪৫ দিনে (১২ ডিসেম্বর থেকে ২৬ জানুয়ারি) সারাদেশে অন্তত ১৪৪টি বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ভোটের মূল লড়াই শুরু হওয়ার আগেই রাজনীতির মাঠ ৪ জন কর্মীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। বিশেষ করে শেরপুরের শ্রীবরদীতে যেভাবে এক রাজনৈতিক নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কদর্য রূপকেই প্রকাশ করে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা বাংলাদেশের এই পরিস্থিতিকে ‘ফ্রাইটেনিং সিচুয়েশন’ বা ভয়াবহ হিসেবে অভিহিত করেছে। যখন বৈশ্বিক গণমাধ্যম আমাদের গণতান্ত্রিক উত্তরণকে এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন বুঝতে হবে সংকটের গভীরতা কতখানি।

ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির মধ্যকার ফাটলই হতে পারে ফ্যাসিবাদের ফেরার সবচেয়ে সহজ সুড়ঙ্গ। যে রাজনৈতিক দলগুলো রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের বুলেট মোকাবিলা করেছিল, আজ ক্ষমতার অলীক মোহে তারা একে অপরের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের পবিত্র রক্তের সাথে এক ধরনের চরম বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। নেতাদের উসকানিমূলক ভাষা বা ‘হেইট স্পিচ’ আজ মাঠপর্যায়ের সাধারণ কর্মীদের বেপরোয়া ও সহিংস করে তুলছে। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মারা এখনো প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এবং সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণিতে ঘাপটি মেরে আছে। তারা এই সুযোগেরই অপেক্ষায় আছে—কখন আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে সংঘাতে লিপ্ত হব এবং তারা বিশ্বদরবারে ‘বাংলাদেশি গণতন্ত্র ব্যর্থ’ বলে চিৎকার করার সুযোগ পাবে। অভ্যন্তরীণ এই দুর্বলতাই বহিরাগত শক্তির হস্তক্ষেপের পথ সুগম করে।

বর্তমান নির্বাচনের এই অস্থিরতাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে বিশৃঙ্খলা তৈরির সুপরিকল্পিত নীল নকশা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার। বর্তমান যুগে ‘ডিপফেক’ প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতাদের কণ্ঠ বা ভিডিও হুবহু নকল করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে কোনো জনপ্রিয় নেতার নামে মিথ্যা ও উসকানিমূলক ভিডিও বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে মুহূর্তের মধ্যে জনপদে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেওয়া সম্ভব। এই প্রযুক্তিনির্ভর অপপ্রচার আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক নতুন ও অদৃশ্য চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্র ও নির্বাচন কমিশনকে তাই কেবল মাঠের নিরাপত্তা নয়, বরং ভার্চুয়াল জগতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সাইবার প্রোপাগান্ডা রুখতে ব্যর্থ হলে আমাদের অর্জিত বিপ্লবের সুফল ডিজিটাল ষড়যন্ত্রের জালে আটকা পড়তে পারে।

নির্বাচনকে অর্থবহ ও গ্রহণযোগ্য করতে হলে এখন প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে কার্যকরী ‘নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরি করতে হবে। প্রথমত, সংবেদনশীল নির্বাচনী অঞ্চলগুলোতে সেনাবাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি ও টহল জনমনে আস্থার সঞ্চার করবে, যা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা রুখতে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, সব ফ্যাসিবাদবিরোধী দলের মধ্যে একটি ‘রাজনৈতিক ঐক্য সনদ’ বা ‘নির্বাচনী আচরণবিধি’ থাকা আবশ্যক, যেখানে নেতাদের বক্তব্যে শালীনতা ও কর্মীদের আচরণে সংযম নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকবে। তৃতীয়ত, একটি বিশেষ ‘সাইবার টাস্কফোর্স’ গঠন করে এআই বা ডিপফেক ব্যবহার করে ছড়ানো গুজবগুলো দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে হবে। পরিশেষে, ভোট-পরবর্তী সহিংসতা রোধে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি নির্বাচনের পরেও অন্তত দুই সপ্তাহ বজায় রাখতে হবে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের জয়-পরাজয় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং তা নির্ধারণ করবে নতুন বাংলাদেশের চরিত্র কেমন হবে। ক্ষমতার মোহ যদি আমাদের বিবেককে আচ্ছন্ন করে ফেলে এবং আমরা নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষরণে লিপ্ত হই, তবে ইতিহাসের নিষ্ঠুর কাঠগড়ায় আমাদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হতে হবে। ১৫ বছরের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে সুযোগ পেয়েছি, তা হেলায় হারানো হবে আত্মঘাতী। ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন রুখতে হলে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম সৌহার্দ্য ও আদর্শিক ঐক্য বজায় রাখা এখন কোনো বিকল্প নয়, বরং একমাত্র পথ। নেতাদের মনে রাখতে হবে, ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কেবল একটি ক্ষমতা বদলের পালা নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাগ্য পরিবর্তনের পরীক্ষা। অর্জিত বিপ্লবের ফসল যেন কোনো হায়েনার মুখে চলে না যায়, সেই শপথ হোক আজ প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিকের পাথেয়।