আর মাত্র ১০ দিন পরই আসছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—নিজের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দিন। পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কম জাতির জীবনেই এমন গৌরবময় অধ্যায় আছে, যেখানে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। আমরা সেই গর্বিত জাতি, যারা ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বকে শিখিয়েছিলাম যে—অধিকার কেউ দয়া করে দেয় না, অধিকার আদায় করে নিতে হয়। সেই ঐতিহাসিক চেতনাকে ধারণ করেই আসছে ১২ ফেব্রুয়ারি। এই দিনটি কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয় বরং এটি প্রতিটি বাংলাদেশির জন্য নিজের নাগরিক মর্যাদা প্রমাণের এক অগ্নিপরীক্ষা। এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের প্রকৃত নায়ক কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রভাবশালী নেতা নন; এই লড়াইয়ের একমাত্র নায়ক হলেন সাধারণ ভোটার।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ভোটারই ক্ষমতার প্রকৃত উৎস। সংবিধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ও সরকার—সবকিছুর বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি বা ভোটের মাধ্যমেই। তাই ভোটার যত সচেতন এবং সংকল্পে যত দৃঢ় হবেন, গণতন্ত্র ততটাই শক্তিশালী হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সেই চিরন্তন সত্যটিকেই আবার আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। গণতন্ত্রে ব্যালট কেবল একটি কাগজের টুকরো নয়; এটি এক নীরব বিপ্লবের হাতিয়ার। এই একটি সিল বা একটি বাটনের চাপেই সমাজ থেকে চাঁদাবাজ, দুর্নীতিবাজ, দখলবাজ, মাদক-সন্ত্রাসী এবং ঋণ খেলাপিদের চিরতরে বিদায় করে দেওয়া সম্ভব। ইতিহাস সাক্ষী—যখন সাধারণ মানুষ জাগ্রত হয়ে সচেতনভাবে ভোট দেয়, তখন পৃথিবীর শক্তিশালী কোনো অপশক্তিই সেই গণজোয়ারের সামনে টিকে থাকতে পারে না।
আমাদের দেশের রাজনীতির অদ্ভুত এক সৌন্দর্য ও বাস্তবতা হলো, নির্বাচনের সময় যত বড় প্রভাবশালী নেতা বা হাজার কোটি টাকার মালিকই হোন না কেন, তাকে একজন সাধারণ ভোটারের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতে হয়। সেই গায়ে কাদা-মাটি মাখা কৃষক কিংবা দিনমজুরের হাত ধরে ভোট ভিক্ষা করতে হয়। এই দৃশ্যই প্রমাণ করে যে, গণতন্ত্রে একজন ভোটারের গুরুত্ব কতটা অপরিসীম। ভোটার যদি নিজের এই অন্তর্নিহিত শক্তি উপলব্ধি করতে পারেন, তবে কোনো অন্যায়কারী বা দুর্বৃত্তের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব নয়। ১২ ফেব্রুয়ারির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—ভোটারের অবজ্ঞা নয়, সচেতনতাই পারে সমাজকে কলুষমুক্ত করতে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভোটাধিকার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও যন্ত্রণাদায়ক। দীর্ঘ সময় ধরে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসনব্যবস্থা, নজিরবিহীন অনিয়ম এবং অংশগ্রহণহীন নির্বাচনের কারণে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গাটি বারবার ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। বহু মানুষ বছরের পর বছর নিজের ভোটটি দিতে পারেননি—কখনো ভয়ের কারণে, কখনো অনাস্থার কারণে, আবার কখনো ব্যবস্থার প্রতি চরম বিতৃষ্ণা থেকে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সেই বঞ্চিত মানুষের জন্য একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। এটি কেবল সরকার পরিবর্তনের ভোট নয়, বরং এটি নিজের হারানো নাগরিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের দিন। যারা এতদিন ভেবেছেন ‘ভোট দিয়ে কী হবে’, তাদের জন্য এই নির্বাচন নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের এক বড় ক্ষেত্র।
তবে ভোটারদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কাকে ভোট দেবেন? মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র কেবল সংখ্যার খেলা নয়; এটি নৈতিকতারও পরীক্ষা। এমন একজনকে বেছে নেওয়া ভোটারের পবিত্র দায়িত্ব, যিনি সব ধরনের বিতর্কমুক্ত। যিনি চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস বা মাদকের পৃষ্ঠপোষকতা করেন না। ভুল নেতৃত্ব মানেই হচ্ছে একটি প্রজন্মের অন্ধকার ভবিষ্যৎ। আজ যদি ভোটার অর্থ বা কোনো ক্ষণস্থায়ী প্রলোভনের কাছে হার মানেন, তবে তার মাশুল পুরো জাতিকে আগামী অনেক বছর ধরে দিতে হবে। নাগরিক জীবনে আবারও নেমে আসতে পারে ফ্যাসিবাদের ছায়া, দুর্বল হবে আইনের শাসন এবং বিপর্যস্ত হবে জাতীয় অর্থনীতি। তাই এই ভোট নির্ধারণ করবে আমাদের রাষ্ট্র কোন পথে চলবে—সুশাসনের পথে নাকি অন্ধকারের পথে।
বর্তমানে সারা দেশে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। প্রচার-প্রচারণা, মিছিল আর স্লোগানে মুখর চারপাশ। কিন্তু এর মাঝেই সহিংসতার কালো মেঘও দেখা যাচ্ছে। হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের খবর ভোটারদের মনে ভয়ের সৃষ্টি করছে, যা কোনোভাবেই একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশের লক্ষণ নয়। এই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কমিশনকে হতে হবে ইস্পাতকঠিন নিরপেক্ষ এবং বাহিনীকে নিশ্চিত করতে হবে প্রতিটি ভোটারের নিরাপত্তা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিও এখন বাংলাদেশের ওপর। একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল দেশের ভাবমূর্তিতে উজ্জ্বল করবে না, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন দুয়ার খুলে দেবে। আর এই সফলতার মূলে থাকবেন সেই জাগ্রত ভোটাররা।
নির্বাচনের আর মাত্র দশ দিন বাকি। এখন সময় আবেগ নয়, যুক্তি দিয়ে ভাবার। গুজব বা প্ররোচনায় কান না দিয়ে প্রার্থীর অতীত ও প্রতিশ্রুতি যাচাই করাই এখন ভোটারের প্রধান কাজ। ১২ ফেব্রুয়ারির সকালে ভোটকেন্দ্রে যাওয়া মানে হচ্ছে বিশ্বকে জানিয়ে দেওয়া—“আমি আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতন, আমি কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেব না।” মনে রাখবেন, এই নির্বাচনে আপনিই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। আপনার সঠিক সিদ্ধান্তে গড়ে উঠতে পারে একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর সমাজ। আর আপনার উদাসীনতা ডেকে আনতে পারে পুরনো সেই স্বৈরতন্ত্র। তাই দেশের প্রয়োজনে, নিজের অধিকারের প্রয়োজনে ১২ ফেব্রুয়ারি হোক ব্যালটের মাধ্যমে অন্যায়কে প্রত্যাখ্যান করার এক স্মরণীয় দিন।
রিপোর্টারের নাম 
























