ঢাকা ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ভারতকে বুঝতে হবে

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:৩৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

## বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব অনুধাবন করুক ভারত

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তার ফলস্বরূপ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নবদিগন্ত উন্মোচনের প্রেক্ষাপটে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত মনোভাব অনুধাবন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘটনাপ্রবাহ, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সমীকরণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে এবং আওয়ামী লীগের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। এর পরপরই, ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা বর্তমানে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে। এই রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে অভূতপূর্ব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তাও নতুনভাবে মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সাড়ে ১৫ বছর এবং এর পূর্বে ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার সম্পর্ককে প্রায়শই ‘রোল মডেল’ হিসেবে প্রচার করা হলেও, বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে এই সম্পর্কের সমতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সব চাওয়া পূরণ করেছে এবং বাংলাদেশের স্বার্থের চেয়ে ভারতের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতা ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হতো না—এই ধারণাটি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রবল।

ভারতের সহযোগিতায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং জনগণের ভোটাধিকার খর্ব হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত-বাংলাদেশ মধ্যে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি, যেমন—চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, বাংলাদেশের নদীপথ ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের রেল চলাচল ইত্যাদি—এসব ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু এবং সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ না হওয়া, ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করেছে।

ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের মূল ভূখণ্ড এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান পথ হলো শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কলকাতা থেকে আগরতলার দূরত্ব অনেক কম হলেও, ভারতের একতরফা নীতি এবং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে রেল চলাচল বা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি প্রদানে অনীহা, পারস্পরিক সহযোগিতার অভাবকেই তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। অথচ, ভারত প্রায়শই বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের কাল্পনিক অভিযোগ উত্থাপন করে, যা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। ভারতের এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার নীতি, বাংলাদেশের সর্বজনীন পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি বাংলাদেশের জনগণ, এমনকি অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ও সমর্থন করে না।

বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক চায়, তবে তা অবশ্যই সমতার ভিত্তিতে। ভারত একটি বৃহত্তর রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা। ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা, কোনো বিশেষ দল বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে নয়। এই পরিবর্তনই দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ককে টেকসই করতে পারে।

স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ, তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গড়ে ওঠা উচিত, যা উভয় দেশের জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ একতরফা সম্পর্ক চায় না।


[এই অংশটি লেখকের ব্যক্তিগত পরিচয় এবং যোগাযোগের তথ্য, যা মূল নিউজ আর্টিকেলের অংশ নয়। এটি কেবল তথ্যের জন্য এখানে রাখা হয়েছে, মূল আর্টিকেলে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।]
প্রকৌশলী ও রাষ্ট্রচিন্তক গবেষক
ই-মেইল : omar_ctg123@yahoo.com

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব ভারতকে বুঝতে হবে

আপডেট সময় : ১০:৩৭:৪৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

## বাংলাদেশের জনগণের মনোভাব অনুধাবন করুক ভারত

ঢাকা: বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তার ফলস্বরূপ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নবদিগন্ত উন্মোচনের প্রেক্ষাপটে, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতকে বাংলাদেশের জনগণের প্রকৃত মনোভাব অনুধাবন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও ভারতে আশ্রয় গ্রহণ এবং পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘটনাপ্রবাহ, দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের সমীকরণকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।

দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে এবং আওয়ামী লীগের শাসনের অবসান ঘটিয়েছে। এর পরপরই, ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়, যা বর্তমানে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে কাজ করছে। এই রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যে অভূতপূর্ব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, তাও নতুনভাবে মূল্যায়নের মুখোমুখি হয়েছে।

২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা সাড়ে ১৫ বছর এবং এর পূর্বে ১৯৯৬-২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় ছিল। এই সময়ে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যেকার সম্পর্ককে প্রায়শই ‘রোল মডেল’ হিসেবে প্রচার করা হলেও, বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে এই সম্পর্কের সমতা ও ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সব চাওয়া পূরণ করেছে এবং বাংলাদেশের স্বার্থের চেয়ে ভারতের স্বার্থকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ভারতের সর্বাত্মক সহযোগিতা ছাড়া আওয়ামী লীগের পক্ষে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সম্ভব হতো না—এই ধারণাটি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে প্রবল।

ভারতের সহযোগিতায় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে এবং জনগণের ভোটাধিকার খর্ব হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত-বাংলাদেশ মধ্যে স্বাক্ষরিত বিভিন্ন চুক্তি, যেমন—চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার, বাংলাদেশের নদীপথ ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের রেল চলাচল ইত্যাদি—এসব ক্ষেত্রে ভারতের স্বার্থকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। তবে, তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ইস্যু এবং সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বন্ধ না হওয়া, ভারতের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ন করেছে।

ভূ-রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতের মূল ভূখণ্ড এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যের মধ্যে যোগাযোগের প্রধান পথ হলো শিলিগুড়ি করিডোর, যা ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে কলকাতা থেকে আগরতলার দূরত্ব অনেক কম হলেও, ভারতের একতরফা নীতি এবং বাংলাদেশের ওপর দিয়ে রেল চলাচল বা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি প্রদানে অনীহা, পারস্পরিক সহযোগিতার অভাবকেই তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই একটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, যেখানে বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। অথচ, ভারত প্রায়শই বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের কাল্পনিক অভিযোগ উত্থাপন করে, যা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার করেছে। ভারতের এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার নীতি, বাংলাদেশের সর্বজনীন পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং এটি বাংলাদেশের জনগণ, এমনকি অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ও সমর্থন করে না।

বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক চায়, তবে তা অবশ্যই সমতার ভিত্তিতে। ভারত একটি বৃহত্তর রাষ্ট্র হিসেবে দায়িত্বশীল আচরণ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা। ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা, কোনো বিশেষ দল বা সম্প্রদায়ের সঙ্গে নয়। এই পরিবর্তনই দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ককে টেকসই করতে পারে।

স্বাধীনতা অর্জনে ভারতের সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ, তবে এর অর্থ এই নয় যে, বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা বিসর্জন দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক গড়ে ওঠা উচিত, যা উভয় দেশের জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করবে। বাংলাদেশ একতরফা সম্পর্ক চায় না।


[এই অংশটি লেখকের ব্যক্তিগত পরিচয় এবং যোগাযোগের তথ্য, যা মূল নিউজ আর্টিকেলের অংশ নয়। এটি কেবল তথ্যের জন্য এখানে রাখা হয়েছে, মূল আর্টিকেলে এটি অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।]
প্রকৌশলী ও রাষ্ট্রচিন্তক গবেষক
ই-মেইল : omar_ctg123@yahoo.com