আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে আয়োজিত গণভোট নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা কাটিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বিএনপি। গত শুক্রবার রাতে রংপুরের এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ চিহ্নে ভোট দেওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগমুহূর্তে তারেক রহমানের এই ঘোষণা বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের বিভ্রান্তি দূর করতে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সংসদ নির্বাচনে একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর প্রস্তাবনাগুলোর ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই সনদে সংবিধান সংশ্লিষ্ট ৪৮টিসহ মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো গৃহীত হলে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস পাবে এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতায় ভারসাম্য আসবে। পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ী রূপ পাবে, যা ভবিষ্যতে যেকোনো স্বৈরশাসনের পথ রুদ্ধ করবে।
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ইতিপূর্বে এই সংস্কার প্রক্রিয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করলেও গণভোটের প্রচারণায় দলটির অংশগ্রহণ ছিল কিছুটা অস্পষ্ট। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বিভিন্ন সময়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করলেও দলটির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট ও মাঠপর্যায়ের একটি বড় অংশ ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে আসছিল। ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
এই প্রেক্ষাপটে রংপুরের সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি পৃথক ব্যালটে দয়া করে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন।” তিনি আবু সাঈদ ও ওয়াসিমসহ জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, মানুষের ভোটাধিকার ও কথা বলার অধিকার ফিরিয়ে আনতে এই সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে বিএনপির দেওয়া প্রস্তাবের অনেক মিল রয়েছে এবং জুলাই সনদে স্বাক্ষরকারী দল হিসেবে এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা নৈতিক দায়িত্ব।
এদিকে নির্বাচনের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে এক রাজনৈতিক নেতার হত্যাকাণ্ড এবং বিভিন্ন স্থানে জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে মাঠপর্যায়ে কিছুটা অসহিষ্ণুতা দেখা দিলেও উভয় দলের শীর্ষ নেতৃত্ব শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবশ্য সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, নির্বাচনে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব সহ্য করা হবে না। অন্যদিকে, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং আইজিপি বাহারুল আলমও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মতো দলগুলো যখন ‘না’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, তখন তারেক রহমানের এই ‘হ্যাঁ’ বার্তার ঘোষণা বিএনপির জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল সংস্কারের প্রতি বিএনপির অঙ্গীকারই প্রকাশ করে না, বরং নির্বাচনের মাঠে নিজেদের অবস্থানকেও সংহত করে। এখন দেখার বিষয়, শীর্ষ নেতৃত্বের এই নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং সাধারণ ভোটাররা সংস্কারের এই আহ্বানে কীভাবে সাড়া দেন।
রিপোর্টারের নাম 
























