ঢাকা ০২:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও সত্যের সংকট: কোন পথে আমাদের রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যম?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:১১:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও সত্য প্রকাশ ক্রমশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দলের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা করলেই বিশ্লেষককে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক ট্যাগ বা দলীয় তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি প্রবল হয়ে উঠেছে। বিএনপির সমালোচনা করলে জামায়াতপন্থী আর জামায়াতের সমালোচনা করলে বিএনপিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করার এই প্রবণতা সুস্থ ধারার রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পথকে রুদ্ধ করছে। ফলে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত ‘সমালোচনা ও প্রশ্ন করার অধিকার’ আজ হুমকির মুখে।

এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে জন্ম নিয়েছে একশ্রেণির ‘দলদাস’ বিশ্লেষক। টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই মুখ ও নির্দিষ্ট বয়ান বারবার ফিরে আসছে। তারা মূলত জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ ও নেতাদের তুষ্ট করতেই বেশি সচেষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই নৈতিক ও কাঠামোগত সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডালের মতে, গণতন্ত্রের জন্য ‘এনলাইটেনড আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা জনগণের কাছে সঠিক ও বহুমাত্রিক তথ্য থাকা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে তথ্যপ্রবাহের এই বিকৃতি গণতন্ত্রকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত করছে।

দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির ভেতরেও তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের মতো অভিযোগ রয়েছে। আবার জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধেও সুযোগসন্ধানী রাজনীতির অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এসব বিষয়ে কথা বললেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের আধিপত্য এবং আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ তরুণ প্রজন্মকে হতাশ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট প্রদানের বিষয়ে বিএনপির অস্পষ্ট অবস্থান বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তবে গত শুক্রবার রংপুরের জনসভায় তারেক রহমান জুলাই সনদকে সম্মান জানিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করায় সেই বিতর্কের অবসান ঘটেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়, যে দল সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তারা নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা হারায়। তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত দলকে একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনীতির এই সংকটে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মূলধারার মিডিয়ার একটি বড় অংশ এখন সংবাদমূল্যের চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নোয়াম চমস্কি যেমনটি বলেছিলেন, করপোরেট ও রাজনৈতিক স্বার্থ যখন মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তা জনগণের কণ্ঠস্বর না হয়ে ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই আস্থার সংকটের কারণেই মানুষ এখন বিকল্প হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যদিও সেখানে গুজব ও বিভ্রান্তির ঝুঁকি রয়েছে, তবুও মানুষ সেখান থেকেই সত্য খোঁজার চেষ্টা করছে।

তৃণমূলের মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। কারা চাঁদাবাজি করছে বা কারা ভয় দেখাচ্ছে, তা সাধারণ ব্যবসায়ীদের অজানা নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস স্কটের ‘হিডেন ট্রান্সক্রিপ্ট’ তত্ত্ব অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে চুপ থাকলেও ভেতরে ভেতরে সব হিসাব কষে রাখে। ভোটের সময় এই অভিজ্ঞতাই তাদের সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে বিশ্লেষকদের নিরপেক্ষতা, সংবাদমাধ্যমের পেশাদারত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকা জরুরি। সত্য বলা যদি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তবে সেই সমাজ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অতি সামান্য—তারা কেবল তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চায়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের ভয় দেখানো বা নারীদের লক্ষ্য করে অপপ্রচার চালানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো শক্তি টিকে থাকতে পারেনি। জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ তরুণ ভোটার, যারা দীর্ঘ সময় ভোট দিতে পারেনি, তারা এখন নিজেদের অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্টের মতে, ক্ষমতার আসল উৎস হলো জনগণের সম্মতি। ভয় দেখিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা ধরে রাখার দিন শেষ হয়ে গেছে। জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত আর তরুণদের সচেতন অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, ভোটাধিকার হরণের যেকোনো অপচেষ্টা এবার কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও সত্যের সংকট: কোন পথে আমাদের রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যম?

আপডেট সময় : ১০:১১:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ ও সত্য প্রকাশ ক্রমশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো দলের ভুলত্রুটি নিয়ে আলোচনা করলেই বিশ্লেষককে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক ট্যাগ বা দলীয় তকমা দেওয়ার সংস্কৃতি প্রবল হয়ে উঠেছে। বিএনপির সমালোচনা করলে জামায়াতপন্থী আর জামায়াতের সমালোচনা করলে বিএনপিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করার এই প্রবণতা সুস্থ ধারার রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পথকে রুদ্ধ করছে। ফলে গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত ‘সমালোচনা ও প্রশ্ন করার অধিকার’ আজ হুমকির মুখে।

এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে জন্ম নিয়েছে একশ্রেণির ‘দলদাস’ বিশ্লেষক। টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে একই মুখ ও নির্দিষ্ট বয়ান বারবার ফিরে আসছে। তারা মূলত জনস্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থ ও নেতাদের তুষ্ট করতেই বেশি সচেষ্ট। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই নৈতিক ও কাঠামোগত সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট ডালের মতে, গণতন্ত্রের জন্য ‘এনলাইটেনড আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বা জনগণের কাছে সঠিক ও বহুমাত্রিক তথ্য থাকা জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে তথ্যপ্রবাহের এই বিকৃতি গণতন্ত্রকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিণত করছে।

দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপির ভেতরেও তৃণমূল পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের মতো অভিযোগ রয়েছে। আবার জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধেও সুযোগসন্ধানী রাজনীতির অভিযোগ ওঠে। কিন্তু এসব বিষয়ে কথা বললেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের আধিপত্য এবং আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট কাঠামোর সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ তরুণ প্রজন্মকে হতাশ করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট প্রদানের বিষয়ে বিএনপির অস্পষ্ট অবস্থান বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। তবে গত শুক্রবার রংপুরের জনসভায় তারেক রহমান জুলাই সনদকে সম্মান জানিয়ে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করায় সেই বিতর্কের অবসান ঘটেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটনের ভাষায়, যে দল সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, তারা নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা হারায়। তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত দলকে একটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে রক্ষা করেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

রাজনীতির এই সংকটে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। মূলধারার মিডিয়ার একটি বড় অংশ এখন সংবাদমূল্যের চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। নোয়াম চমস্কি যেমনটি বলেছিলেন, করপোরেট ও রাজনৈতিক স্বার্থ যখন মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন তা জনগণের কণ্ঠস্বর না হয়ে ক্ষমতার হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই আস্থার সংকটের কারণেই মানুষ এখন বিকল্প হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যদিও সেখানে গুজব ও বিভ্রান্তির ঝুঁকি রয়েছে, তবুও মানুষ সেখান থেকেই সত্য খোঁজার চেষ্টা করছে।

তৃণমূলের মানুষ বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন। কারা চাঁদাবাজি করছে বা কারা ভয় দেখাচ্ছে, তা সাধারণ ব্যবসায়ীদের অজানা নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস স্কটের ‘হিডেন ট্রান্সক্রিপ্ট’ তত্ত্ব অনুযায়ী, সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে চুপ থাকলেও ভেতরে ভেতরে সব হিসাব কষে রাখে। ভোটের সময় এই অভিজ্ঞতাই তাদের সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণে বিশ্লেষকদের নিরপেক্ষতা, সংবাদমাধ্যমের পেশাদারত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকা জরুরি। সত্য বলা যদি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তবে সেই সমাজ দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অতি সামান্য—তারা কেবল তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চায়। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটারদের ভয় দেখানো বা নারীদের লক্ষ্য করে অপপ্রচার চালানোর খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

ইতিহাস সাক্ষী দেয়, জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে কোনো শক্তি টিকে থাকতে পারেনি। জুলাই বিপ্লবের রক্তক্ষয়ী স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ তরুণ ভোটার, যারা দীর্ঘ সময় ভোট দিতে পারেনি, তারা এখন নিজেদের অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হান্না আরেন্টের মতে, ক্ষমতার আসল উৎস হলো জনগণের সম্মতি। ভয় দেখিয়ে বা বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতা ধরে রাখার দিন শেষ হয়ে গেছে। জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত আর তরুণদের সচেতন অবস্থান এটাই প্রমাণ করে যে, ভোটাধিকার হরণের যেকোনো অপচেষ্টা এবার কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যাত হবে।