গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো জনগণের সচেতন ও অবাধ মতপ্রকাশ। কিন্তু বর্তমান সময়ে এই আস্থার ভিত্তিকে তছনছ করে দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI)। প্রযুক্তি যখন মানুষের চেয়েও নিখুঁতভাবে মিথ্যা বলতে শুরু করে, তখন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ব্যালট বাক্সের চ্যালেঞ্জ থাকে না; তা হয়ে দাঁড়ায় সত্য রক্ষার এক অসম যুদ্ধ। বিশেষ করে ‘ডিপফেক’—এআই দিয়ে তৈরি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবি—এখন গণতন্ত্রকে দুর্বল করার এক শক্তিশালী মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তি যখন রাজনৈতিক অস্ত্র
এআই প্রযুক্তির সাহায্যে এখন এমন ভিডিও তৈরি করা সম্ভব, যেখানে একজন শীর্ষ নেতার মুখে এমন কথা বসিয়ে দেওয়া যায় যা তিনি কখনোই বলেননি। সাবেক গুগল সিইও এরিক শ্মিট যথার্থই বলেছিলেন, “এআই মানুষের চেয়ে বুদ্ধিমান হয়ে উঠবে সেটা বড় বিপদ নয়; বরং যাচাই ছাড়াই মানুষ এআই-তৈরি তথ্যকে বিশ্বাস করবে, এটাই আসল ঝুঁকি।” বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধার এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর ‘নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর’ ডিপফেক ভিডিও প্রচার এর একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ।
কেন এআই ভিডিও বেশি বিপজ্জনক?
১. নিখুঁত অনুকরণ: আসল ও নকলের পার্থক্য করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
২. দ্রুত বিস্তার: সত্য যাচাই হওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
৩. বিশ্বাসের বিনাশ: মানুষ যখন দৃশ্যমান ভিডিওকেও অবিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর থেকেই আস্থা হারিয়ে ফেলে।
৪. ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব: বাংলাদেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যেকোনো ভিডিওকেই ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেয়, যা অপপ্রচারকারীদের জন্য বড় সুযোগ।
বাংলাদেশের বাস্তবতা: ডিপফেক ও চিপফেক
বাংলাদেশে উন্নত এআই-এর পাশাপাশি সস্তা সফটওয়্যার বা পুরোনো ভিডিও কাটছাঁট করে তৈরি ‘চিপফেক’ বা ‘শ্যালোফেক’—এর প্রবণতাও বাড়ছে। ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর এই দেশে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক হয়ে উঠেছে অপতথ্যের প্রধান উর্বর ভূমি। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর ‘বটবাহিনী’ সমন্বিতভাবে এই গুজবগুলো ছড়িয়ে দেয়, যার ফলে প্রার্থীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পর্যন্ত বাধার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রতিকার ও করণীয়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন এই ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখনো সীমিত। এই সংকট উত্তরণে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি:
- বিশেষায়িত টাস্কফোর্স: নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সেল গঠন করা যারা তাৎক্ষণিকভাবে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে কাজ করবে।
- সোশ্যাল মিডিয়া সমন্বয়: মেটা (ফেসবুক), গুগল ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগসূত্র স্থাপন করা যাতে নির্বাচনী মৌসুমে সন্দেহজনক ভিডিও দ্রুত সরিয়ে নেওয়া যায়।
- ডিজিটাল সাক্ষরতা অভিযান: সাধারণ ভোটারদের শেখাতে হবে কীভাবে একটি ভিডিওর সত্যতা যাচাই করতে হয় এবং যাচাই ছাড়া কোনো কিছু শেয়ার না করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
- আইনের কঠোর প্রয়োগ: আরপিও (RPO) অনুযায়ী যারা এআই ব্যবহার করে বিভ্রান্তি ছড়াবে, তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
এআই প্রযুক্তি নিজে কোনো শত্রু নয়; শত্রু হলো এর নিয়ন্ত্রণহীন অপব্যবহার। যদি এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হয়, তবে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা মুছে গিয়ে গণতন্ত্রের ভিত্তিই ধসে পড়তে পারে। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সফল করতে হলে ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তার পাশাপাশি ডিজিটাল জগতের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
রিপোর্টারের নাম 
























