ঢাকা ০৪:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় কাঁটা নির্বাচনী সহিংসতা: প্রশ্নাতীত ভোটাধিকার নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৯:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল হলো নির্বাচন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনমতের প্রতিফলন ঘটে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার আইনি বৈধতা নিশ্চিত হয়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের প্রাক্কালে সহিংসতা এক দীর্ঘস্থায়ী ও উদ্বেগজনক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে সেই পুরনো আশঙ্কাই নতুন করে জনমনে দানা বাঁধছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা, বাগ্‌যুদ্ধ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রচারণার শুরুর দিকে দেশের অধিকাংশ এলাকায় পরিবেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থানে প্রচারণায় বাধা প্রদান, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক তৎপরতা সরাসরি মাঠপর্যায়ের সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের অন্তত ১০টি জেলায় নির্বাচনী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শেরপুরের ঝিনাইগাতী এলাকায় সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা নির্বাচনী আমেজকে বিষাদে পরিণত করেছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা, সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় মারামারি এবং নারী কর্মীদের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে, আবার কোথাও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হচ্ছে। এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্নতর এবং তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের মানুষ একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। এই নির্বাচন ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে পলাতক অগণতান্ত্রিক শক্তির দোসররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে বাংলাদেশপন্থি ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করতে হবে যে, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না—সেটি দলীয় পরিচয় যা-ই হোক না কেন। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠে দৃশ্যমান করতে হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনায় তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই পেশিশক্তি ব্যবহারের সাহস না পায়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক গুজব ও অপপ্রচার রোধে সাইবার নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। জনগণের ভোটাধিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা আবারও মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় কাঁটা নির্বাচনী সহিংসতা: প্রশ্নাতীত ভোটাধিকার নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান

আপডেট সময় : ১০:০৯:০৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল হলো নির্বাচন। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনমতের প্রতিফলন ঘটে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার আইনি বৈধতা নিশ্চিত হয়। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের প্রাক্কালে সহিংসতা এক দীর্ঘস্থায়ী ও উদ্বেগজনক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকে সেই পুরনো আশঙ্কাই নতুন করে জনমনে দানা বাঁধছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা, বাগ্‌যুদ্ধ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের খবর নির্বাচনের সামগ্রিক পরিবেশকে এক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রচারণার শুরুর দিকে দেশের অধিকাংশ এলাকায় পরিবেশ তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির অবনতি হতে শুরু করেছে। বিভিন্ন স্থানে প্রচারণায় বাধা প্রদান, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক তৎপরতা সরাসরি মাঠপর্যায়ের সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশের অন্তত ১০টি জেলায় নির্বাচনী সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে শেরপুরের ঝিনাইগাতী এলাকায় সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা নির্বাচনী আমেজকে বিষাদে পরিণত করেছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা, সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় মারামারি এবং নারী কর্মীদের ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার মতো ন্যাক্কারজনক ঘটনাও ঘটেছে। কোথাও রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ছে, আবার কোথাও তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হচ্ছে। এসব ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে বড় অন্তরায়।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্নতর এবং তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশের মানুষ একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে পেয়েছে। এই নির্বাচন ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে বিদেশে পলাতক অগণতান্ত্রিক শক্তির দোসররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

বর্তমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে নির্বাচনকে কলঙ্কমুক্ত রাখতে বাংলাদেশপন্থি ও গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করতে হবে যে, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না—সেটি দলীয় পরিচয় যা-ই হোক না কেন। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে মাঠে দৃশ্যমান করতে হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের যেকোনো ঘটনায় তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। তৃতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে কোনো পক্ষই পেশিশক্তি ব্যবহারের সাহস না পায়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক গুজব ও অপপ্রচার রোধে সাইবার নজরদারি আরও জোরদার করা জরুরি। জনগণের ভোটাধিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা আবারও মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।