ঢাকা ০৪:৩১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে নতুন মেরুকরণ: ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আঞ্চলিক প্রভাব

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৪৮:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেশী ও দীর্ঘদিনের বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গভীর ঐতিহাসিক বন্ধন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টারস’ রাজ্যগুলোর প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। তবে, সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ককে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

প্রচলিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বাংলাদেশের ওপর ভারতের একচেটিয়া প্রভাব কমে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনে ভারতের ভূমিকা থাকলেও, এবারের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের অবিশ্বাস ও চাপের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের প্রতি ক্রমবর্ধমান এই অবিশ্বাস, ভারতের দিক থেকে সৃষ্ট নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, কিছু ক্ষেত্রে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড, হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু আগ্রাসী নীতির কারণে জন্ম নিয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

গত বছরের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাটি বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত দেড় বছর ধরে দুই দেশের মধ্যেকার কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এক ঐতিহাসিক নিম্নমুখী ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, অভিযোগ এবং প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের যে অবনতি ঘটেছে, তা ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ের চেয়েও বেশি শীতল বলে অনেকে মনে করছেন। সে সময় ভারত কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি বা বাণিজ্যে বাধা দেয়নি, এমনকি সামরিক শাসনামলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিসা প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ এবং খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী রপ্তানিতেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

অন্যদিকে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য বিশ্বব্যাপী সমালোচিত ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। এই অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানের পরিবর্তে, ভারত প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘু ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভিয়েনা কনভেনশনের ২২ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে, হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি’ আগরতলায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনে হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত তাদের প্রভাব হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।

ভারত সম্প্রতি নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতেও তাদের প্রভাব হারিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পর ভারতের কিছু কূটনৈতিক পদক্ষেপকে ‘উন্মাদের মতো’ এবং ‘কূটনীতিবহির্ভূত’ বলে আখ্যায়িত করছেন অনেকে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের মুখে বন্ধুত্বের কথা বলা হলেও, তাদের অনেক কর্মকাণ্ডে বৈরী মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই নতুন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে নতুন মেরুকরণ: ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ও আঞ্চলিক প্রভাব

আপডেট সময় : ০৯:৪৮:১২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের প্রধান প্রতিবেশী ও দীর্ঘদিনের বন্ধু রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বর্তমানে এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গভীর ঐতিহাসিক বন্ধন থাকা সত্ত্বেও, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ককে এক ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘সেভেন সিস্টারস’ রাজ্যগুলোর প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। তবে, সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ককে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

প্রচলিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, শেখ হাসিনার সরকার পতনের পর বাংলাদেশের ওপর ভারতের একচেটিয়া প্রভাব কমে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনে ভারতের ভূমিকা থাকলেও, এবারের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জাতীয় স্বার্থকে প্রভাবিত করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গেও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের অবিশ্বাস ও চাপের সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে ভারতের প্রতি ক্রমবর্ধমান এই অবিশ্বাস, ভারতের দিক থেকে সৃষ্ট নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ, কিছু ক্ষেত্রে প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড, হিন্দুত্ববাদের উত্থান এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কিছু আগ্রাসী নীতির কারণে জন্ম নিয়েছে বলে পর্যবেক্ষকদের ধারণা।

গত বছরের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ঘটনাটি বাংলাদেশ-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্ককে এক কঠিন পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। গত দেড় বছর ধরে দুই দেশের মধ্যেকার কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এক ঐতিহাসিক নিম্নমুখী ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, অভিযোগ এবং প্রচারণার অভিযোগ উঠেছে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের যে অবনতি ঘটেছে, তা ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সময়ের চেয়েও বেশি শীতল বলে অনেকে মনে করছেন। সে সময় ভারত কোনো ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি বা বাণিজ্যে বাধা দেয়নি, এমনকি সামরিক শাসনামলেও সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ভিসা প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ এবং খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী রপ্তানিতেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে।

অন্যদিকে, সংখ্যালঘু নির্যাতনের জন্য বিশ্বব্যাপী সমালোচিত ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটছে। এই অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো সমাধানের পরিবর্তে, ভারত প্রতিবেশী দেশের সংখ্যালঘু ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভিয়েনা কনভেনশনের ২২ নম্বর ধারা লঙ্ঘন করে, হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘হিন্দু সংঘর্ষ সমিতি’ আগরতলায় বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশনে হামলা চালিয়েছে। এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারত তাদের প্রভাব হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন।

ভারত সম্প্রতি নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতেও তাদের প্রভাব হারিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ভারতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পর ভারতের কিছু কূটনৈতিক পদক্ষেপকে ‘উন্মাদের মতো’ এবং ‘কূটনীতিবহির্ভূত’ বলে আখ্যায়িত করছেন অনেকে। ভারতের নীতিনির্ধারকদের মুখে বন্ধুত্বের কথা বলা হলেও, তাদের অনেক কর্মকাণ্ডে বৈরী মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে সমালোচকরা মনে করেন। এই নতুন ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।