ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি ‘কালের কণ্ঠ’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে দেশের সামগ্রিক সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে তিনি দুর্নীতি প্রতিরোধে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনগণের সক্রিয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
দুর্নীতি প্রতিরোধে ৪টি অপরিহার্য উপাদান
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুর্নীতি কেবল আইন দিয়ে বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য ৪টি স্তম্ভ প্রয়োজন:
১. রাজনৈতিক সদিচ্ছা: সরকারকে সত্যিকার অর্থে দুর্নীতিমুক্ত হওয়ার অঙ্গীকার করতে হবে।
২. আইনি জবাবদিহি: দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
৩. প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা: দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে।
৪. জনগণের সচেতনতা: সাধারণ মানুষকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।
সংস্কার ও দুদকের স্থবিরতা
দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান হিসেবে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, কমিশনের দেওয়া ৪৭টি সুপারিশের মধ্যে অনেক মৌলিক ও কৌশলগত বিষয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, দুদকের ভেতরেই গুরুতর দুর্নীতি বিদ্যমান এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশও কার্যকর করা হয়নি। সরকারের ‘অ্যাডহক’ বা সাময়িক সংস্কার পদ্ধতিকে তিনি হতাশাজনক বলে অভিহিত করেন।
১৬ বছরে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার
অর্থপাচার নিয়ে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে দেশ থেকে গড়ে প্রতিবছর ১৬ বিলিয়ন ডলার করে মোট প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এই বিশাল অংকের অর্থ ফেরত আনা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টায় এটি পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
“টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৯ শতাংশ মানুষ ঘুষ না দিলে সেবা পায় না। এই বাস্তবতা মানুষকে দুর্নীতিতে বাধ্য করছে।” > — ড. ইফতেখারুজ্জামান
মব সংস্কৃতি ও আসন্ন নির্বাচন
৫ আগস্টের পরবর্তী ‘মব সংস্কৃতি’ নিয়ে তিনি বলেন, ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী জঞ্জাল সরাতে গিয়ে অনেকে ‘দখলবাজি’ ও ‘মামলা-গ্রেপ্তার বাণিজ্য’ শুরু করেছেন, যা উদ্বেগের। আসন্ন নির্বাচন সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ধর্মের ব্যবহার এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির ইন্ধন মোকাবিলা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রত্যাশিত বাংলাদেশ ও সুশাসন
সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি বলেন, স্বাধীনতার চেতনা অনুযায়ী দুর্নীতিমুক্ত সুশাসিত রাষ্ট্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়াকে তিনি আইনের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা গণতান্ত্রিক ও দুর্নীতিমুক্ত না হলে দেশে কখনোই পূর্ণাঙ্গ সুশাসন আসবে না।
রিপোর্টারের নাম 
























