ঢাকা ০৪:৩২ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশে নির্বাচন: ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:২৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন একটি জটিল ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। স্বৈরাচারী শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার দীর্ঘ সময়ে এ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের ধারণা থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি পর্বই ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সাক্ষী।

ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত ১৯৬৫ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক প্রতিচ্ছবি। যদিও জনসমর্থনের নিরিখে ফাতিমা জিন্নাহ এগিয়ে ছিলেন, তবুও মৌলিক গণতন্ত্রের কাঠামোর সুবিধা নিয়ে আইয়ুব খান বিজয়ী হন। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, জনগণের সরাসরি ভোটদানের সুযোগ থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৭০ সালের নির্বাচন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। যদিও এই নির্বাচনকে অবাধ বলা যেতে পারে, তবে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আইয়ুব খানের পতনের পর মুসলিম লীগের দুর্বল অবস্থান এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নির্বাচন বর্জন কার্যত আওয়ামী লীগের জন্য একতরফা বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে। এই নির্বাচনের ফলাফলই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের নির্বাচন ব্যতীত প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, ১৯৭৩ সালের নির্বাচন যদি আওয়ামী লীগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে পারত, তবে দেশের রাজনৈতিক ধারা হয়তো অন্য খাতে প্রবাহিত হতো। কিন্তু সেই সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থার যে অবক্ষয় শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়েও প্রভাব ফেলেছে। এটি একদিকে যেমন আওয়ামী লীগকে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনই জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকেও সীমিত করেছে। বিগত ৫৪ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের ২৪ বছরের শাসনকাল সহ প্রায় ৩২ বছর জনগণ অগণতান্ত্রিক শাসনের অধীনে ছিল, যা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের সংখ্যাকে কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষত, গত ১৫ বছরের শাসন ব্যবস্থা জনগণের আস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।

এই পটভূমিতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে চলেছে। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচন কতটা অর্থবহ হবে, তা নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে গভীর আগ্রহ রয়েছে। অতীতে দলটি স্বেচ্ছায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও, এবার মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বর্জন ছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপটের। একটি কর্তৃত্ববাদী দলের জন্য এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর, বিশেষত যখন তারা ভিন্নমতের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করতে দ্বিধা করেনি। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যখন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের মালিকানা বোধ কাজ করে, তখন বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নেওয়া তাদের জন্য কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের রাজনীতি এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি জরুরি মূল্যায়ন অপরিহার্য।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

বাংলাদেশে নির্বাচন: ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও ভবিষ্যৎ ভাবনা

আপডেট সময় : ০৯:২৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন একটি জটিল ও বহুমাত্রিক অধ্যায়। স্বৈরাচারী শাসন থেকে গণতন্ত্রের পথে যাত্রার দীর্ঘ সময়ে এ দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের ধারণা থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত প্রতিটি পর্বই ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতার সাক্ষী।

ষাট দশকের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত ১৯৬৫ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ছিল সেই সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক প্রতিচ্ছবি। যদিও জনসমর্থনের নিরিখে ফাতিমা জিন্নাহ এগিয়ে ছিলেন, তবুও মৌলিক গণতন্ত্রের কাঠামোর সুবিধা নিয়ে আইয়ুব খান বিজয়ী হন। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, জনগণের সরাসরি ভোটদানের সুযোগ থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতে পারত।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৭০ সালের নির্বাচন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। যদিও এই নির্বাচনকে অবাধ বলা যেতে পারে, তবে এর নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আইয়ুব খানের পতনের পর মুসলিম লীগের দুর্বল অবস্থান এবং মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নির্বাচন বর্জন কার্যত আওয়ামী লীগের জন্য একতরফা বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে। এই নির্বাচনের ফলাফলই বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছিল।

১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০৮ সালের নির্বাচন ব্যতীত প্রায় প্রতিটি জাতীয় নির্বাচন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, ১৯৭৩ সালের নির্বাচন যদি আওয়ামী লীগ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে পারত, তবে দেশের রাজনৈতিক ধারা হয়তো অন্য খাতে প্রবাহিত হতো। কিন্তু সেই সময়ে নির্বাচন ব্যবস্থার যে অবক্ষয় শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়েও প্রভাব ফেলেছে। এটি একদিকে যেমন আওয়ামী লীগকে অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে, তেমনই জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকেও সীমিত করেছে। বিগত ৫৪ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগের ২৪ বছরের শাসনকাল সহ প্রায় ৩২ বছর জনগণ অগণতান্ত্রিক শাসনের অধীনে ছিল, যা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের সংখ্যাকে কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষত, গত ১৫ বছরের শাসন ব্যবস্থা জনগণের আস্থা প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে।

এই পটভূমিতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে চলেছে। আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের অনুপস্থিতিতে এই নির্বাচন কতটা অর্থবহ হবে, তা নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে গভীর আগ্রহ রয়েছে। অতীতে দলটি স্বেচ্ছায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করলেও, এবার মানবতাবিরোধী অপরাধের কারণে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বর্জন ছিল ভিন্ন প্রেক্ষাপটের। একটি কর্তৃত্ববাদী দলের জন্য এমন পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর, বিশেষত যখন তারা ভিন্নমতের জন্য অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করতে দ্বিধা করেনি। শীর্ষ নেতাদের মধ্যে যখন দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে নিজেদের মালিকানা বোধ কাজ করে, তখন বর্তমান পরিস্থিতি মেনে নেওয়া তাদের জন্য কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের রাজনীতি এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে একটি জরুরি মূল্যায়ন অপরিহার্য।