বাংলাদেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের চারটি বড় প্রকল্প কৃত্রিমভাবে বিনিয়োগের পরিমাণ কয়েক গুণ বেশি দেখিয়ে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক বিশাল ‘ছক’ কষেছে। বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো বিদ্যুৎ খাতের আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে এই লুণ্ঠন নিশ্চিত করেছে। বিদ্যুৎ খাতে অনিয়ম তদন্তে গঠিত জাতীয় কমিটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর ‘বিশেষ কেরামতি’ বলে অভিহিত করেছেন।
বিনিয়োগের আড়ালে অর্থপাচারের কৌশল: তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সামিট, ইউনিক, জেরা এবং ইউনাইটেড গ্রুপের মেঘনাঘাট ও আনোয়ারা কেন্দ্রগুলো তাদের প্রকৃত নির্মাণ ব্যয়ের চেয়ে ৪১ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত বেশি বিনিয়োগ দেখিয়েছে। এই অতিরিক্ত বিনিয়োগ দেখানোর মূল উদ্দেশ্য হলো ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ বা কেন্দ্রভাড়া হিসেবে বড় অংকের টাকা আদায় নিশ্চিত করা। নিয়ম অনুযায়ী, বিনিয়োগ ও ঋণের পরিমাণ যত বেশি দেখানো যায়, কেন্দ্রভাড়া তত বেশি নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
কোম্পানিভিত্তিক লুটের খতিয়ান:
- সামিট মেঘনাঘাট-২: এই কেন্দ্রটিকে তদন্তকারীরা ‘টাকা কামানোর মেশিন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সামিট গ্রুপ তাদের ৫৮৩ মেগাওয়াটের প্রকল্পে বাস্তবতার চেয়ে ৪৫.৭ শতাংশ বেশি বিনিয়োগ দেখিয়েছে। এর ফলে পরবর্তী ২১ বছরে পিডিবিকে প্রায় ৬২ কোটি ডলার (প্রায় ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা) অতিরিক্ত দিতে হবে। চুক্তির ১১তম বছর থেকে ২২তম বছর পর্যন্ত সামিট গ্রুপকে তাদের প্রাপ্যের চেয়ে ৪০০ গুণ বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়ার অদ্ভুত শর্ত চুক্তিতে রাখা হয়েছে।
- ইউনিক মেঘনাঘাট: এই প্রকল্পটি ২১ বছরে সরকারের কাছ থেকে ৬০ কোটি ৫৬ লাখ ডলার (প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা) বাড়তি আদায়ের পরিকল্পনা করেছে। তাদের বিনিয়োগ মূল্য বাস্তবতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ধরা হয়েছে।
- জেরা মেঘনাঘাট: রিলায়েন্স গ্রুপ ভারত থেকে পুরোনো মেশিন এনে এই কেন্দ্রটি স্থাপন করেছিল, যা পরে জাপানের জেরা কোম্পানির কাছে বিক্রি করা হয়। ২২ বছরে এই প্রকল্প থেকে ৪৫.৬ শতাংশ বেশি অর্থাৎ প্রায় ৮৩ কোটি ডলার অতিরিক্ত হাতিয়ে নেওয়ার ছক করা হয়েছে।
- ইউনাইটেড আনোয়ার: এই কেন্দ্রটি এখনও উৎপাদনে আসেনি, অথচ তারা ইতিমধ্যে প্রকৃত ব্যয়ের চেয়ে ৫১.৯ শতাংশ বা প্রায় ৮৬ কোটি ডলার বেশি বিনিয়োগ দেখিয়ে সরকারের সঙ্গে চুক্তি সেরে ফেলেছে।
এসএস পাওয়ার ও এস আলমের নজিরবিহীন জালিয়াতি: এস আলম গ্রুপের চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াটের ‘এসএস পাওয়ার’ প্রকল্পটি থেকে বিদ্যুৎ না নিলেও প্রতি মাসে ৩৯৩ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিচ্ছে পিডিবি। ২৫ বছরে এই গ্রুপটি ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে পাবে। তদন্তে দেখা গেছে, এই কেন্দ্র স্থাপনের জন্য দুটি ভিন্ন দরপত্রের কার্যাদেশকে অবৈধভাবে একীভূত করা হয়েছিল এবং তাদের জন্য ১৫ বছরের আয়কর ও আমদানি শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। জুন ২০২৪ পর্যন্ত এই কেন্দ্রটি মাত্র ৪১৪ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেও এর ক্রয়মূল্য পড়েছে ইউনিট প্রতি ১৬.২৬ টাকা।
সৌরবিদ্যুতেও ‘ছায়াবাজি’: কেবল তাপবিদ্যুৎ নয়, সৌরবিদ্যুতের নামেও চলেছে হরিলুট। তিস্তা (২০০ মেগাওয়াট), এনারগন (১০০ মেগাওয়াট) এবং ডায়নামিক সান কোম্পানির সৌরবিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১৮ টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে বৈশ্বিক বাজারে সৌরবিদ্যুতের দাম ৫-৬ টাকার বেশি নয়। এই তিনটি কোম্পানি বিনিয়োগের অংক বাড়িয়ে দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে প্রায় ৯২ কোটি ডলার (প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা) অতিরিক্ত হাতিয়ে নেওয়ার আয়োজন করে রেখেছে।
জাতীয় কমিটি তাদের প্রতিবেদনে মন্তব্য করেছে যে, এই অসম চুক্তিগুলো সরাসরি দেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আঘাত। উচ্চ হারের এই ক্যাপাসিটি চার্জ কমানোর জন্য বেসরকারি কোম্পানিগুলোর সাথে নতুন করে দর-কষাকষি করা এবং যেখানে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে সরাসরি চুক্তি বাতিল করার সুপারিশ করেছে কমিটি।
রিপোর্টারের নাম 























