বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আত্মীয়-স্বজনদের একটি বিশাল ‘পুনর্বাসন কেন্দ্রে’ পরিণত হয়েছিল। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে, বয়স জালিয়াতি এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই সংস্থাটিতে অন্তত ১৫৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযান চললেও বিটিআরসি এখনও এই ‘অবৈধ সিন্ডিকেট’-এর কবজায় রয়েছে।
১. নিয়োগ জালিয়াতির নীলনকশা
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে একটি নিয়োগ সার্কুলার প্রকাশ করা হলেও সেখানে কোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। বরং রাজনৈতিক প্রভাবে ২৯ জন জুনিয়র কনসালট্যান্ট এবং ২১ জন প্রকল্প কর্মকর্তাকে সরাসরি রাজস্ব খাতে আত্তীকরণ করা হয়। তৎকালীন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছিল যে, ১৯৯৭ পরবর্তী কোনো প্রকল্পের জনবল সরাসরি আত্তীকরণের সুযোগ নেই। তবুও এইচটি ইমাম, বাহাউদ্দিন নাছিম এবং তারেক সিদ্দিকীর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশে এই নিয়োগ সম্পন্ন হয়।
২. বয়স ও যোগ্যতার ভয়াবহ জালিয়াতি
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিটিআরসির অনেক কর্মকর্তা সরকারি চাকরির নির্ধারিত বয়সসীমা পার হওয়ার অনেক পরে চাকরি পেয়েছেন:
- শেখ মোয়াজ্জেম হোসেন: বয়সসীমা ১৬ বছর অতিক্রম করার পর অফিস সহকারী পদে নিয়োগ।
- দেওয়ান এম ফারুক আহমেদ: বয়সসীমা ৬ বছর অতিক্রম করার পর প্রটোকল সহকারী পদে নিয়োগ।
- রেজাউল করিম: বয়সসীমা সাড়ে ৫ বছর অতিক্রম করার পর নিয়োগ।
- এম গোলাম রাজ্জাক: বয়সসীমা ১ বছর ৯ মাস অতিক্রম করার পর নিয়োগ।
- শারমিন সুলতানা: বয়সসীমা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই নিয়োগ পান। তার দুলাভাই ফেনীর প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন নাসিম।
৩. অডিট আপত্তি ও প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা
২০২৩ সালে মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (CAG) দপ্তর থেকে একটি কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনা করা হয়। ওই অডিট রিপোর্টে [নং-৮২.১৫.০০০০.০০৩.১১.০০২.২৩-৬৩৫ (ক)] স্পষ্টভাবে ২৯ জন পরামর্শককে বিধিবহির্ভূতভাবে নিয়োগ এবং বয়স জালিয়াতির বিষয়ে আপত্তি তোলা হয়। কিন্তু তৎকালীন চেয়ারম্যান জহুরুল হক এবং শ্যাম সুন্দর সিকদার এই অডিট আপত্তি নিরসনের পরিবর্তে ওই কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে সিন্ডিকেটকে আরও শক্তিশালী করেছেন।
৪. প্রভাবশালী ‘হোতা’ সিন্ডিকেট
বিটিআরসির এই অবৈধ সিন্ডিকেটের পেছনে কয়েকজন মূল হোতার নাম উঠে এসেছে:
- এম এ তালেব হোসেন: এইচটি ইমামের আপন ভাতিজা এবং এই সিন্ডিকেটের অন্যতম নিয়ন্ত্রক।
- খালেদ ফয়সল রহমান: কুমিল্লার আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে, যিনি কোনো মেধা যাচাই ছাড়াই সরাসরি নিয়োগ পান।
- আশীষ কুমার কুন্ডু: সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেকের সুপারিশে নিয়োগপ্রাপ্ত এবং বর্তমানে মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং)। তার বিরুদ্ধে এফডিআর কমিশন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে।
৫. বর্তমান স্থবিরতা ও পদোন্নতি বঞ্চিতরা
বিটিআরসিতে বর্তমানে ৩৫৫ জন স্থায়ী জনবল থাকলেও তাদের এক-তৃতীয়াংশই অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত। ৫ আগস্টের পর বঞ্চিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য পদোন্নতি প্রত্যাশা করলেও এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে তা আটকে আছে। বরং অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তরা এখন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন উপপরিচালক থেকে পরিচালক পদে পদোন্নতি হাতিয়ে নেওয়ার জন্য।
বিটিআরসির বর্তমান চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী এই স্পর্শকাতর বিষয়ে কথা না বললেও প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি জানুয়ারি মাসের মধ্যেই এসব বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 























