ঢাকা ০২:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আদানির চুক্তিতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেন: তথ্য পেল জাতীয় কমিটি

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৪০:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ‘অনিয়মে ভরপুর’ ২৫ বছরের বিদ্যুৎ চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল ‘আর্থিক অভিশাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটি। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির নেপথ্যে সাত থেকে আটজন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ যাবতীয় তথ্য ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য ও অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান এই ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় এত স্বচ্ছ ও শক্তিশালী তথ্য সচরাচর পাওয়া যায় না। এখন দ্রুত সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণসমূহ:

১. আদানির ‘বাড়তি বোঝা’ ও দুর্নীতি: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যান্য উৎস থেকে যেখানে বিদ্যুৎ কেনা হয়, আদানির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেওয়া হচ্ছে। ২০১৫ সালে চুক্তি অনুযায়ী দাম ছিল ৮.৬১ সেন্ট, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৪.৮৭ সেন্টে। এর ফলে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার বাড়তি দিতে হচ্ছে। আদানির বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তারা এখনও প্রতিবেদনের কপি পায়নি।

২. ‘বিদ্যুৎ দানব’ সামিট ও এস আলম: আওয়ামী লীগ সরকারের সরাসরি সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও সামিটকে বছরে প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার প্রকল্পে মাসে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ছিল ৩৯২ কোটি টাকা, যা ২৫ বছরে ১.১৭ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছাতে পারে।

৩. দেউলিয়ার পথে পিডিবি: বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানান, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন চারগুণ বাড়লেও আইপিপি-দের পরিশোধিত অর্থ বেড়েছে ১১ গুণ। বর্তমানে পিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

৪. অসম দামের পরিসংখ্যান: প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশেষ আইনের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ বাজারদরের চেয়ে ৭০-৮০ শতাংশ বেশি দামে এবং ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ ৪০-৫০ শতাংশ বেশি দামে কেনা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন, যা দেশের শিল্পখাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

জাতীয় কমিটির সুপারিশ:

  • চুক্তি বাতিল: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া চুক্তিসমূহ অবিলম্বে বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করা।
  • দরপত্র বাধ্যতামূলক: ভবিষ্যতে যে কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা।
  • জনমত গঠন: আদানির মতো বড় চুক্তি বাতিল করলে সাময়িকভাবে লোডশেডিং বাড়তে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদী মুক্তির জন্য জনগণকে সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
  • স্বাধীন সংস্থা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে একটি স্বাধীন তদারকি ও তদন্ত প্রতিষ্ঠান গঠন করা।

কমিটির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। আমরা চাই পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও যেন এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে দেশকে এই ‘অভিশপ্ত’ চুক্তি থেকে মুক্ত করে।”

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

আদানির চুক্তিতে কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেন: তথ্য পেল জাতীয় কমিটি

আপডেট সময় : ০১:৪০:৫৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৬ জানুয়ারী ২০২৬

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ‘অনিয়মে ভরপুর’ ২৫ বছরের বিদ্যুৎ চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল ‘আর্থিক অভিশাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটি। কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই চুক্তির নেপথ্যে সাত থেকে আটজন ব্যক্তির কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ যাবতীয় তথ্য ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠানো হয়েছে।

রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিটির সদস্য ও অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান এই ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “লন্ডনের বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দুর্নীতি মামলায় এত স্বচ্ছ ও শক্তিশালী তথ্য সচরাচর পাওয়া যায় না। এখন দ্রুত সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে।”

প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণসমূহ:

১. আদানির ‘বাড়তি বোঝা’ ও দুর্নীতি: প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্যান্য উৎস থেকে যেখানে বিদ্যুৎ কেনা হয়, আদানির ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ৪-৫ সেন্ট বেশি দেওয়া হচ্ছে। ২০১৫ সালে চুক্তি অনুযায়ী দাম ছিল ৮.৬১ সেন্ট, যা ২০২৫ সালে এসে দাঁড়িয়েছে ১৪.৮৭ সেন্টে। এর ফলে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ কোটি ডলার বাড়তি দিতে হচ্ছে। আদানির বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, তারা এখনও প্রতিবেদনের কপি পায়নি।

২. ‘বিদ্যুৎ দানব’ সামিট ও এস আলম: আওয়ামী লীগ সরকারের সরাসরি সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও সামিটকে বছরে প্রায় ২,১০০ কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপের এসএস পাওয়ার প্রকল্পে মাসে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ছিল ৩৯২ কোটি টাকা, যা ২৫ বছরে ১.১৭ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছাতে পারে।

৩. দেউলিয়ার পথে পিডিবি: বিশ্বব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন জানান, ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন চারগুণ বাড়লেও আইপিপি-দের পরিশোধিত অর্থ বেড়েছে ১১ গুণ। বর্তমানে পিডিবি বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান গুনছে। ২০২৫ সাল নাগাদ এই বকেয়া দায় ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

৪. অসম দামের পরিসংখ্যান: প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশেষ আইনের আওতায় সৌরবিদ্যুৎ বাজারদরের চেয়ে ৭০-৮০ শতাংশ বেশি দামে এবং ফার্নেস অয়েল ভিত্তিক বিদ্যুৎ ৪০-৫০ শতাংশ বেশি দামে কেনা হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে পাইকারি বিদ্যুতের দাম অন্তত ৮৬ শতাংশ বাড়ানো প্রয়োজন, যা দেশের শিল্পখাতকে পঙ্গু করে দিতে পারে।

জাতীয় কমিটির সুপারিশ:

  • চুক্তি বাতিল: আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া চুক্তিসমূহ অবিলম্বে বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করা।
  • দরপত্র বাধ্যতামূলক: ভবিষ্যতে যে কোনো বিদ্যুৎ প্রকল্পে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা।
  • জনমত গঠন: আদানির মতো বড় চুক্তি বাতিল করলে সাময়িকভাবে লোডশেডিং বাড়তে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদী মুক্তির জন্য জনগণকে সাময়িক কষ্ট সহ্য করার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
  • স্বাধীন সংস্থা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ফেরাতে একটি স্বাধীন তদারকি ও তদন্ত প্রতিষ্ঠান গঠন করা।

কমিটির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, “বল এখন বিদ্যুৎ বিভাগের কোর্টে। আমরা চাই পরবর্তী নির্বাচিত সরকারও যেন এই প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে দেশকে এই ‘অভিশপ্ত’ চুক্তি থেকে মুক্ত করে।”