জুলাই বিপ্লবের সময় রাজধানীর চানখারপুল এলাকায় শাহরিয়ার খান আনাসসহ ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ সোমবার। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করবেন।
এর আগে গত ২০ জানুয়ারি এই মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য থাকলেও আইনি প্রক্রিয়া ও রায় প্রস্তুত না হওয়ায় তারিখ পিছিয়ে আজকের দিন নির্ধারণ করা হয়। গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, গত ১৭ নভেম্বর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম রায় দিয়েছিল এই ট্রাইব্যুনাল। সেই রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল। আজকের রায়টি জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ রায় হতে যাচ্ছে।
প্রসিকিউটর গাজী তামীম মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানান, রাষ্ট্রপক্ষ মোট ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি ছাড়াও বিপুল পরিমাণ তথ্য-প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনা ও শেখ ফজলে নূর তাপসের কথোপকথনের অডিও রেকর্ড, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানের ওয়্যারলেস বার্তা, পুলিশের নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ভিডিও ফুটেজ এবং ফরেনসিক প্রতিবেদন। এছাড়া ঘটনার দিন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সদস্যদের নামে ইস্যু করা অস্ত্রের রেকর্ডও প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হয়েছে। বিশেষ করে, যেসব পুলিশ সদস্য অস্ত্র পেলেও গুলি চালাননি, তাদের সাক্ষ্য এই মামলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
প্রসিকিউশন দাবি করেছে, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অভিযোগ তারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছেন। ফলে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির পাশাপাশি পলাতক আসামিদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।
এই মামলার মোট আসামি আটজন। তারা হলেন— ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মোহাম্মদ আখতারুল ইসলাম, সাবেক সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ ইমরুল, শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশনস) আরশাদ হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলাম। আসামিদের মধ্যে আরশাদ, সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল বর্তমানে কারাগারে থাকলেও হাবিবুর রহমানসহ বাকি চারজন এখনো পলাতক রয়েছেন।
মামলার বিবরণে জানা যায়, জুলাই বিপ্লবের উত্তাল সময়ে চানখারপুলে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণের মাধ্যমে ছয়জনকে হত্যার পরিকল্পনা, উস্কানি ও প্রত্যক্ষ সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ‘সুপিরিওর কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা উচ্চতর পদের দায়বদ্ধতার ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, হাবিবুর রহমান ও সুদীপ কুমার চক্রবর্তীর মতো কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
চানখারপুলের এই নৃশংসতায় প্রাণ হারান শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, মোহাম্মদ ইয়াকুব, রাকিব হাওলাদার, ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া। ২০২৫ সালের ১১ আগস্ট নিহত আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশের সাক্ষ্যদানের মাধ্যমে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২৬ জন এবং আসামিপক্ষে একজন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। আজ এই রায়ের মাধ্যমে শহীদ পরিবারগুলো দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রিপোর্টারের নাম 

























