বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে শরীফ ওসমান হাদির প্রয়াণ কেবল একজন ব্যক্তির বিদায় নয়, বরং এক গভীর জনআবেগের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। গত ডিসেম্বরে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে তার জানাজায় লাখো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করেছে যে, সাধারণ মানুষের হৃদয়ে তিনি কতটা শক্ত স্থান করে নিয়েছিলেন। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগ যেমন একটি স্বৈরশাসনের পতন নিশ্চিত করে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে, হাদির মৃত্যু সেখানে এক নতুন ও অমীমাংসিত রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। একেই এখন বিশ্লেষকরা ‘হাদি প্রভাব’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
হাদির বিশেষত্ব ছিল তার সাধারণ জীবনযাপন এবং প্রখর মেধার সংমিশ্রণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়েও তিনি তার গ্রামীণ শেকড় এবং আঞ্চলিক ভাষাকে বিসর্জন দেননি। তার এই ‘মাটির ভাষা’ ঢাকার উচ্চবিত্ত ও অভিজাত শ্রেণির তথাকথিত মার্জিত ভাষার বিপরীতে সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত আপন হয়ে উঠেছিল। সমাজের প্রতিষ্ঠিত শ্রেণিবিন্যাসকে চ্যালেঞ্জ করার মতো যোগ্যতা ও সাহস—উভয়ই তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল। বিশেষ করে ৯৫ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত এই দেশে তার ধর্মীয় মূল্যবোধ ও স্বাতন্ত্র্যবোধ সাধারণ মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে হাদি এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশে যে বিশেষ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি হয়েছিল, তিনি তার কঠোর সমালোচক ছিলেন। প্রচলিত মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ যখন একটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট ছিল, হাদি তখন সাহসের সঙ্গে তার বিরোধিতা করেন। তিনি মনে করতেন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়কে প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তিনি ‘ইনকিলাব সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি বিকল্প সাংস্কৃতিক অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়।
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে হাদির প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। কোনো বড় রাজনৈতিক দলের সমর্থন ছাড়াই তিনি একজন প্রভাবশালী ও বিত্তবান প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নামেন। তার নির্বাচনি প্রচারণায় ছিল না কোনো জাঁকজমক বা বিশাল গাড়িবহর; বরং সাধারণ মানুষের ভালোবাসা ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দানেই তার প্রচারকার্য পরিচালিত হতো। ভোটারদের সঙ্গে ফজরের নামাজ আদায় করা কিংবা শ্রমজীবী মানুষের পাড়া-মহল্লায় পায়ে হেঁটে সংযোগ স্থাপন করার মধ্য দিয়ে তিনি এক নতুন ধারার রাজনীতির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
হাদির আবেদনের মূলে ছিল তার সততা এবং সাহসিকতা। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও দুঃশাসনে ক্লান্ত সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক আস্থার প্রতীক। তিনি কোনো বড় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের চেয়েও বেশি জোর দিয়েছিলেন ক্ষমতাবানদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সত্য বলার ওপর। জুলাই বিপ্লবের সরাসরি নকশাকার না হয়েও তিনি ছিলেন সেই বিপ্লব-পরবর্তী আকাঙ্ক্ষার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকারী।
শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড তাই কেবল একটি জীবনের অবসান নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের অধিকার ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার এই অকাল মৃত্যু যে শূন্যতা তৈরি করেছে, তা আগামী নির্বাচনে এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। হাদি আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থাকলেও তার আদর্শ ও ‘হাদি প্রভাব’ জনমানসে এক জীবন্ত শক্তি হিসেবে রয়ে গেছে।
রিপোর্টারের নাম 

























