ঢাকা ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

রাজস্ব সংকটের মধ্যেই সরকারি কর্মচারীদের বিশাল বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ: প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১২:৩০:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নামার মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর নিয়ে এসেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই এই প্রতিবেদন জমা দেন কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান। প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন ধাপের বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপের বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতির নাজুক অবস্থায় এই বিশাল ব্যয়ভার সরকার কীভাবে বহন করবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা এবং বিশাল ঘাটতির মুখে এই বর্ধিত বেতন কাঠামো কার্যকর করা সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির এই সময়ে সরকারের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা এখনো অস্পষ্ট। অন্যদিকে, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করেছেন যে, অতীতে বেতন বাড়ানোর ঘোষণার পরপরই বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম না হলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীরা চরম মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বেন। সরকারি চাকুরেদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো জরুরি হলেও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় না বাড়ায় এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০টি ধাপ বহাল রেখে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য ভাতাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ এবং যাতায়াত ভাতা ১০ম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পেনশনভোগীদের ওপর; যেখানে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এই সুপারিশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত একটি কমিটি গঠন করা হবে যারা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।

নতুন এই বেতন কাঠামোর পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠনের মতো যুগান্তকারী প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় এই সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এখন সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশনও শীঘ্রই চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না আনলে এই বেতন বৃদ্ধি হিতে বিপরীত হতে পারে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার পদধ্বনি: আইএমএফের সতর্কবার্তা

রাজস্ব সংকটের মধ্যেই সরকারি কর্মচারীদের বিশাল বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ: প্রভাব ও চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ১২:৩০:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২৬

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধস নামার মধ্যেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বড় সুখবর নিয়ে এসেছে নবম জাতীয় বেতন কমিশন। চলতি অর্থবছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ৪৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেলেও, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। বুধবার (২১ জানুয়ারি) অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে নির্ধারিত সময়ের তিন সপ্তাহ আগেই এই প্রতিবেদন জমা দেন কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান। প্রতিবেদনে সর্বনিম্ন ধাপের বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপের বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনীতির নাজুক অবস্থায় এই বিশাল ব্যয়ভার সরকার কীভাবে বহন করবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজস্ব আদায়ে স্থবিরতা এবং বিশাল ঘাটতির মুখে এই বর্ধিত বেতন কাঠামো কার্যকর করা সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো হবে। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনীতির এই সময়ে সরকারের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার মতো অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা এখনো অস্পষ্ট। অন্যদিকে, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সতর্ক করেছেন যে, অতীতে বেতন বাড়ানোর ঘোষণার পরপরই বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়। এবারও তার ব্যতিক্রম না হলে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীরা চরম মূল্যস্ফীতির চাপে পড়বেন। সরকারি চাকুরেদের জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো জরুরি হলেও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আয় না বাড়ায় এই সিদ্ধান্ত অর্থনীতিতে বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ২০টি ধাপ বহাল রেখে বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্যান্য ভাতাতেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ এবং যাতায়াত ভাতা ১০ম গ্রেড পর্যন্ত সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পেনশনভোগীদের ওপর; যেখানে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া ৭৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য ১০ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদন গ্রহণকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এই সুপারিশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দ্রুত একটি কমিটি গঠন করা হবে যারা বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করবে।

নতুন এই বেতন কাঠামোর পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা প্রবর্তন, পেনশন ব্যবস্থার সংস্কার এবং সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড পুনর্গঠনের মতো যুগান্তকারী প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। কমিশন প্রধান জাকির আহমেদ খান জানান, গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় এই সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। তবে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন এখন সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশনও শীঘ্রই চূড়ান্ত করা হবে বলে জানা গেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য না আনলে এই বেতন বৃদ্ধি হিতে বিপরীত হতে পারে।