ঢাকা ০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

টেকনাফ সীমান্তে অর্ধশতাধিক স্থলমাইনের অংশ উদ্ধার: আতঙ্ক ও নিরাপত্তার নতুন সংকট

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) যৌথ অভিযানে অর্ধশতাধিক স্থলমাইনের ‘চাপ প্লেট’ বা ট্রিগার অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে প্রায় ৩০০ স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে—এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরপরই গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়। উদ্ধারকৃত এই সরঞ্জামগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলমাইনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অগ্রভাগ, যা মাটির ওপর বা সামান্য নিচে থাকলে সামান্য চাপে মাইনকে সক্রিয় করে তোলে।

সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে কারণ গত তিন বছরে এই অঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ২৭ জন হতাহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সর্বশেষ গত ১২ জানুয়ারি নাফ নদ সংলগ্ন এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ নামে এক যুবক তার পা হারান। স্থানীয়দের দাবি, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঠেকাতে এবং সীমান্তে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এই মাইনগুলো পুঁতে রাখছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদের বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে এসে মাইন স্থাপন করতে দেখা গেছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। বিস্ফোরণে কেবল মানুষ নয়, বন্য হাতিও প্রাণ হারাচ্ছে, যা বনাঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে আনছে।

উখিয়ায় দায়িত্বরত বিজিবি ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন যে উদ্ধারকৃত চাপ প্লেটগুলোতে বর্তমানে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া না গেলেও এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষজ্ঞ দল এসব সরঞ্জামের উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। উদ্ধারকৃত ৫০ থেকে ৬০টি প্লেট বর্তমানে হোয়াইক্যং বিজিবি ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। একটি স্থলমাইন সাধারণত কেসিং, বিস্ফোরক, বুস্টার চার্জ এবং ফায়ারিং মেকানিজম বা চাপ প্লেট—এই চারটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এবারের অভিযানে কেবল উপরিভাগের চাপ প্লেটগুলো পাওয়া গেছে যা সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং জান্তা বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতের রেশ এখন বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নাফ নদ ও সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে চলাচলে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সীমান্তের ওপারে চলমান এই ‘ছায়া যুদ্ধ’ ও মাইনের আগ্রাসন বন্ধে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং সীমান্তে আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

রাজনগরে ক্রিকেট খেলা নিয়ে বিরোধ: ছুরিকাঘাতে হিফজ বিভাগের ছাত্র নিহত

টেকনাফ সীমান্তে অর্ধশতাধিক স্থলমাইনের অংশ উদ্ধার: আতঙ্ক ও নিরাপত্তার নতুন সংকট

আপডেট সময় : ০১:১১:১০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) যৌথ অভিযানে অর্ধশতাধিক স্থলমাইনের ‘চাপ প্লেট’ বা ট্রিগার অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে প্রায় ৩০০ স্থলমাইন পুঁতে রেখেছে—এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরপরই গত মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই বিশেষ অভিযান চালানো হয়। উদ্ধারকৃত এই সরঞ্জামগুলো একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলমাইনের সবচেয়ে সংবেদনশীল অগ্রভাগ, যা মাটির ওপর বা সামান্য নিচে থাকলে সামান্য চাপে মাইনকে সক্রিয় করে তোলে।

সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক বিরাজ করছে কারণ গত তিন বছরে এই অঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ২৭ জন হতাহত হয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সর্বশেষ গত ১২ জানুয়ারি নাফ নদ সংলগ্ন এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে মোহাম্মদ হানিফ নামে এক যুবক তার পা হারান। স্থানীয়দের দাবি, আরাকান আর্মি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঠেকাতে এবং সীমান্তে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে এই মাইনগুলো পুঁতে রাখছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষীদের বাংলাদেশের ভূখণ্ডের ভেতরে এসে মাইন স্থাপন করতে দেখা গেছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। বিস্ফোরণে কেবল মানুষ নয়, বন্য হাতিও প্রাণ হারাচ্ছে, যা বনাঞ্চলের পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে আনছে।

উখিয়ায় দায়িত্বরত বিজিবি ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানিয়েছেন যে উদ্ধারকৃত চাপ প্লেটগুলোতে বর্তমানে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া না গেলেও এগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশেষজ্ঞ দল এসব সরঞ্জামের উৎস ও প্রকৃতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। উদ্ধারকৃত ৫০ থেকে ৬০টি প্লেট বর্তমানে হোয়াইক্যং বিজিবি ফাঁড়িতে রাখা হয়েছে। একটি স্থলমাইন সাধারণত কেসিং, বিস্ফোরক, বুস্টার চার্জ এবং ফায়ারিং মেকানিজম বা চাপ প্লেট—এই চারটি অংশের সমন্বয়ে গঠিত হয়। এবারের অভিযানে কেবল উপরিভাগের চাপ প্লেটগুলো পাওয়া গেছে যা সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং জান্তা বাহিনীর মধ্যে চলমান সংঘাতের রেশ এখন বাংলাদেশের টেকনাফ ও উখিয়া সীমান্তকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী ও বিজিবির টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি দ্বিগুণ করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নাফ নদ ও সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে চলাচলে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সীমান্তের ওপারে চলমান এই ‘ছায়া যুদ্ধ’ ও মাইনের আগ্রাসন বন্ধে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ এবং সীমান্তে আধুনিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।