ঢাকা ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

বিমানের অপারেশনস ম্যানুয়াল উপেক্ষা: মাঝআকাশে প্রাণ হারাচ্ছেন যাত্রীরা, তদন্ত কমিটি নিয়ে প্রশ্ন

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে মাঝআকাশে যাত্রীদের অসুস্থতা এবং পরবর্তীতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো আকাশপথে নিরাপত্তার চরম অবহেলাকে সামনে নিয়ে এসেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর সিলেট থেকে লন্ডনগামী বিজি-২০১ ফ্লাইটে তাজাম্মুল আলী নামে এক যাত্রীর মৃত্যু এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে নিকটস্থ লাহোর বিমানবন্দরে নামার নির্দেশ দেওয়া হলেও পাইলট তা অমান্য করে বিমানটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন। এতে বাড়তি তিন ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয় এবং বিনা চিকিৎসায় বিমানেই ওই যাত্রীর মৃত্যু ঘটে।

আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আইন এবং বিমানের নিজস্ব অপারেশনস ম্যানুয়াল অনুযায়ী, ফ্লাইটে কোনো যাত্রীর জীবন বিপন্ন হলে নিকটস্থ উপযুক্ত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ (ডাইভার্শন) করা পাইলট-ইন-কমান্ডের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, বৈমানিকরা এই স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি মানছেন না। তাজাম্মুল আলীর ঘটনায় অভিযুক্ত পাইলট আলেয়া মান্নানের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে ক্যাপ্টেন এনামুল হককে, যার বিরুদ্ধে নিজেই অতীতে একই ধরনের গাফিলতির অভিযোগ ছিল। ২০২৩ সালে দাম্মামগামী একটি ফ্লাইটে একজন প্রবাসী যাত্রী অসুস্থ হলেও তিনি কলকাতা বা দিল্লিতে না নেমে গন্তব্যে চলে যান, ফলে পথেই ওই যাত্রীর মৃত্যু হয়।

বিমানের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ক্যাপ্টেন এনামুল হক বিগত সরকারের এক প্রভাবশালী নেতার আত্মীয় হওয়ায় আগের তদন্ত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানের লঙ্ঘন এবং এটি তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও নভেম্বরেও একই ধরনের অবহেলার কারণে আরও দুই যাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। তৎকালীন ঘটনায় দেখা গেছে, পাইলট ককপিট ছেড়ে বিশ্রামে চলে গিয়েছিলেন অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ সত্ত্বেও নিকটস্থ বিমানবন্দরে অবতরণ করেননি।

বিমানের গ্রাউন্ড স্টাফদের ম্যানেজ করে অসুস্থ যাত্রীদের ফ্লাইটে ওঠা এবং উড্ডয়নকালে বায়ুর চাপের পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট শারীরিক জটিলতা নিরসনে পাইলটদের অনাগ্রহ এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে যে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র তদন্ত কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়; বরং পাইলটদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং এসওপি কঠোরভাবে প্রতিপালন না করলে আকাশপথে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিমুক্ত হবে না।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

উখিয়ায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের মহোৎসব

বিমানের অপারেশনস ম্যানুয়াল উপেক্ষা: মাঝআকাশে প্রাণ হারাচ্ছেন যাত্রীরা, তদন্ত কমিটি নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট সময় : ০১:০১:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে মাঝআকাশে যাত্রীদের অসুস্থতা এবং পরবর্তীতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো আকাশপথে নিরাপত্তার চরম অবহেলাকে সামনে নিয়ে এসেছে। গত ৩১ ডিসেম্বর সিলেট থেকে লন্ডনগামী বিজি-২০১ ফ্লাইটে তাজাম্মুল আলী নামে এক যাত্রীর মৃত্যু এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে নিকটস্থ লাহোর বিমানবন্দরে নামার নির্দেশ দেওয়া হলেও পাইলট তা অমান্য করে বিমানটি ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন। এতে বাড়তি তিন ঘণ্টা সময় অতিবাহিত হয় এবং বিনা চিকিৎসায় বিমানেই ওই যাত্রীর মৃত্যু ঘটে।

আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আইন এবং বিমানের নিজস্ব অপারেশনস ম্যানুয়াল অনুযায়ী, ফ্লাইটে কোনো যাত্রীর জীবন বিপন্ন হলে নিকটস্থ উপযুক্ত বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ (ডাইভার্শন) করা পাইলট-ইন-কমান্ডের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, বৈমানিকরা এই স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি মানছেন না। তাজাম্মুল আলীর ঘটনায় অভিযুক্ত পাইলট আলেয়া মান্নানের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে ক্যাপ্টেন এনামুল হককে, যার বিরুদ্ধে নিজেই অতীতে একই ধরনের গাফিলতির অভিযোগ ছিল। ২০২৩ সালে দাম্মামগামী একটি ফ্লাইটে একজন প্রবাসী যাত্রী অসুস্থ হলেও তিনি কলকাতা বা দিল্লিতে না নেমে গন্তব্যে চলে যান, ফলে পথেই ওই যাত্রীর মৃত্যু হয়।

বিমানের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, ক্যাপ্টেন এনামুল হক বিগত সরকারের এক প্রভাবশালী নেতার আত্মীয় হওয়ায় আগের তদন্ত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানের লঙ্ঘন এবং এটি তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। শুধু এই দুটি ঘটনাই নয়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি ও নভেম্বরেও একই ধরনের অবহেলার কারণে আরও দুই যাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। তৎকালীন ঘটনায় দেখা গেছে, পাইলট ককপিট ছেড়ে বিশ্রামে চলে গিয়েছিলেন অথবা চিকিৎসকের পরামর্শ সত্ত্বেও নিকটস্থ বিমানবন্দরে অবতরণ করেননি।

বিমানের গ্রাউন্ড স্টাফদের ম্যানেজ করে অসুস্থ যাত্রীদের ফ্লাইটে ওঠা এবং উড্ডয়নকালে বায়ুর চাপের পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট শারীরিক জটিলতা নিরসনে পাইলটদের অনাগ্রহ এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে যে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র তদন্ত কমিটি গঠনই যথেষ্ট নয়; বরং পাইলটদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং এসওপি কঠোরভাবে প্রতিপালন না করলে আকাশপথে যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিমুক্ত হবে না।