ঢাকা ০৫:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ এপ্রিল ২০২৬

একীভূত হতে যাওয়া ৫ ব্যাংকের মুনাফা কর্তন: গ্রাহকদের তীব্র অসন্তোষ, সিদ্ধান্তে অটল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা কেটে নেওয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তকে ‘শরিয়াহসম্মত’ ও ‘আন্তর্জাতিক রীতির’ সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বললেও, গ্রাহকদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংককে একত্রিত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দেয়, উল্লিখিত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা আগামী দুই বছর (২০২৪ ও ২০২৫ সাল) তাদের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না। শুধু তাই নয়, যদি কোনো আমানতকারী ইতোমধ্যে এই সময়ের মুনাফা উত্তোলন করে থাকেন, তবে তাদের আমানত থেকে সমপরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক রীতির আলোকে মুনাফায় এই ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, শরিয়াহ নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক ক্ষতির মুখে পড়লে মুনাফা বিতরণ করা যায় না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মধ্যে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে রোববার রাজধানীর গুলশানে একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর ভুক্তভোগী আমানতকারীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া আমানতকারীরা জোর দাবি জানান, ব্যাংকের অনিয়ম বা লুটপাটের দায় কোনোভাবেই আমানতকারীদের ওপর চাপানো যাবে না। তারা তাদের সব আমানত ও ন্যায্য মুনাফা দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। গ্রাহকদের মতে, হঠাৎ করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করবে এবং ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কিছু শাখায় স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়। এই প্রেক্ষিতে রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক রেজুলেশন বিভাগের কর্মকর্তারা গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শরিয়াহ আইনের আলোকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই বলে গভর্নর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হলে পুরো একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও তার পূর্বের অবস্থানেই অটল রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে, দুই বছরের মুনাফা স্থগিত করার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার দায় কমে যাবে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই পাঁচটি ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। মুনাফা কর্তনের এই সিদ্ধান্তের পর আমানতের পরিমাণ আরও কমে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

‘ইরানকে দমানোর সক্ষমতা নিয়ে ভুল ধারণা পোষণ করছে যুক্তরাষ্ট্র’

একীভূত হতে যাওয়া ৫ ব্যাংকের মুনাফা কর্তন: গ্রাহকদের তীব্র অসন্তোষ, সিদ্ধান্তে অটল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

আপডেট সময় : ০৮:৩২:০০ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬

একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা কেটে নেওয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এই সিদ্ধান্তকে ‘শরিয়াহসম্মত’ ও ‘আন্তর্জাতিক রীতির’ সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বললেও, গ্রাহকদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—এই পাঁচটি ব্যাংককে একত্রিত করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘোষণা দেয়, উল্লিখিত ব্যাংকগুলোর আমানতকারীরা আগামী দুই বছর (২০২৪ ও ২০২৫ সাল) তাদের আমানতের ওপর কোনো মুনাফা পাবেন না। শুধু তাই নয়, যদি কোনো আমানতকারী ইতোমধ্যে এই সময়ের মুনাফা উত্তোলন করে থাকেন, তবে তাদের আমানত থেকে সমপরিমাণ অর্থ কেটে নেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক রীতির আলোকে মুনাফায় এই ‘হেয়ারকাট’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, শরিয়াহ নীতিমালা অনুযায়ী কোনো ব্যাংক ক্ষতির মুখে পড়লে মুনাফা বিতরণ করা যায় না।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন আকস্মিক সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মধ্যে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে রোববার রাজধানীর গুলশানে একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংকগুলোর ভুক্তভোগী আমানতকারীরা মানববন্ধন করেন। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া আমানতকারীরা জোর দাবি জানান, ব্যাংকের অনিয়ম বা লুটপাটের দায় কোনোভাবেই আমানতকারীদের ওপর চাপানো যাবে না। তারা তাদের সব আমানত ও ন্যায্য মুনাফা দ্রুত ফেরত দেওয়ার দাবি জানান। গ্রাহকদের মতে, হঠাৎ করে এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট করবে এবং ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কিছু শাখায় স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংককে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়। এই প্রেক্ষিতে রোববার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক রেজুলেশন বিভাগের কর্মকর্তারা গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শরিয়াহ আইনের আলোকে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই বলে গভর্নর স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তার মতে, এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হলে পুরো একীভূতকরণ প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান নিশ্চিত করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও তার পূর্বের অবস্থানেই অটল রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে, দুই বছরের মুনাফা স্থগিত করার ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার দায় কমে যাবে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এই পাঁচটি ব্যাংকের মোট আমানত ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা, যা ডিসেম্বর শেষে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকায় নেমে আসে। মুনাফা কর্তনের এই সিদ্ধান্তের পর আমানতের পরিমাণ আরও কমে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।