ঢাকা ০৪:০৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

নির্বাচনি ইশতেহার ও জবাবদিহিতার সংকট: নিছক প্রতিশ্রুতি নাকি রাষ্ট্র সংস্কারের হাতিয়ার?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১০:০৮:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে এখন নির্বাচনি ইশতেহার তৈরির তোড়জোড় চলছে। মনোনয়ন জমা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় নামবে। বরাবরের মতো এবারও বড় দলগুলো জনকল্যাণমুখী নানা পরিকল্পনা ও আশ্বাসের রূপরেখা জনগণের সামনে হাজির করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে নির্বাচনের আগে দেওয়া এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় ও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নির্বাচনি ইশতেহারে এবারও নতুনত্বের ছোঁয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাদের ইশতেহার সাজাচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী অনলাইনে জনমত যাচাই করে শিক্ষা, নারী নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে জোর লবিং চালাচ্ছে। তারা বলছেন, ইশতেহার কেবল ভোটের প্রচারপত্র নয়, বরং এটি হওয়া উচিত সরকারের কাজের মাপকাঠি। তবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে কী আইনি বা রাজনৈতিক ফল ভোগ করতে হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় ইশতেহার শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিতার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারছে না।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ইশতেহার ও সরকার পরিচালনার মধ্যে কোনো কার্যকর সংযোগ নেই। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি লিড ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ এবং ‘উই ক্যান’-এর সমন্বয়ক জিনাত আরা হকের মতে, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধির মতো মৌলিক বিষয়গুলো ইশতেহারে এলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করার মতো কোনো স্বাধীন কাঠামো নেই। পাঁচ বছর পর ভোট না দেওয়া ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের মধ্যবর্তী সময়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোনো ব্যবস্থা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠেনি। এমনকি বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক একে বাজেটের আগের আলোচনার সাথে তুলনা করে বলেছেন, ইশতেহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও নির্বাচনের পর তা পুরোপুরি বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায়।

দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক প্রবণতাকে ‘দায়সারা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, অতীতের ইশতেহারগুলো বাস্তবায়িত হলে হয়তো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়ত না। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলো যদি ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, তবে তাদের রাষ্ট্র সংস্কারের মূল বিষয়গুলো ইশতেহারে প্রতিফলিত করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক ও গণমাধ্যমকেও দলগুলোর কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা আদায়ে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনায় মধ্যস্থতায় পাকিস্তান, বৈঠক নিয়ে কাটছে না ধোঁয়াশা

নির্বাচনি ইশতেহার ও জবাবদিহিতার সংকট: নিছক প্রতিশ্রুতি নাকি রাষ্ট্র সংস্কারের হাতিয়ার?

আপডেট সময় : ১০:০৮:২৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে এখন নির্বাচনি ইশতেহার তৈরির তোড়জোড় চলছে। মনোনয়ন জমা ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে দলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণায় নামবে। বরাবরের মতো এবারও বড় দলগুলো জনকল্যাণমুখী নানা পরিকল্পনা ও আশ্বাসের রূপরেখা জনগণের সামনে হাজির করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে নির্বাচনের আগে দেওয়া এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে সেগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় ও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

নির্বাচনি ইশতেহারে এবারও নতুনত্বের ছোঁয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তাদের ইশতেহার সাজাচ্ছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী অনলাইনে জনমত যাচাই করে শিক্ষা, নারী নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য দিচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) তাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করতে জোর লবিং চালাচ্ছে। তারা বলছেন, ইশতেহার কেবল ভোটের প্রচারপত্র নয়, বরং এটি হওয়া উচিত সরকারের কাজের মাপকাঠি। তবে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করলে কী আইনি বা রাজনৈতিক ফল ভোগ করতে হবে, তার কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা না থাকায় ইশতেহার শেষ পর্যন্ত জবাবদিহিতার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারছে না।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, ইশতেহার ও সরকার পরিচালনার মধ্যে কোনো কার্যকর সংযোগ নেই। ওয়াটারএইড বাংলাদেশের পলিসি লিড ফাইয়াজউদ্দিন আহমদ এবং ‘উই ক্যান’-এর সমন্বয়ক জিনাত আরা হকের মতে, নিরাপদ পানি ও স্বাস্থ্যবিধির মতো মৌলিক বিষয়গুলো ইশতেহারে এলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করার মতো কোনো স্বাধীন কাঠামো নেই। পাঁচ বছর পর ভোট না দেওয়া ছাড়া জনপ্রতিনিধিদের মধ্যবর্তী সময়ে জবাবদিহিতার আওতায় আনার কোনো ব্যবস্থা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠেনি। এমনকি বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক একে বাজেটের আগের আলোচনার সাথে তুলনা করে বলেছেন, ইশতেহার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও নির্বাচনের পর তা পুরোপুরি বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায়।

দীর্ঘদিনের এই রাজনৈতিক প্রবণতাকে ‘দায়সারা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি মন্তব্য করেছেন যে, অতীতের ইশতেহারগুলো বাস্তবায়িত হলে হয়তো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রয়োজন পড়ত না। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলো যদি ত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে চায়, তবে তাদের রাষ্ট্র সংস্কারের মূল বিষয়গুলো ইশতেহারে প্রতিফলিত করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক ও গণমাধ্যমকেও দলগুলোর কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও জবাবদিহিতা আদায়ে আরও সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের নেতৃবৃন্দ।