ঢাকা ১২:০৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ০১ মার্চ ২০২৬

সাংস্কৃতিক সংঘাত ও সেক্যুলার আধিপত্য: বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতর বিশ্লেষণ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:১০:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
  • ৪ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়, বরং একটি গভীরতর সাংস্কৃতিক সংঘাত বিদ্যমান। রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই বাংলাদেশ এক নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যার ফলে একটি সুসংহত ও স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে এ দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের একটি বড় অংশের অনুসৃত নীতি, যা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে এক ধরনের প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়া জারি রেখেছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই সংকট নিরসনে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর থেকেই এ অঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও আধুনিকায়ন তত্ত্ব দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিল। এই ‘এলিট’ গোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রেই এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দীর্ঘদিনের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় চেতনাকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সেক্যুলারিজমের নামে অনেক সময় ইসলামি মূল্যবোধের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে যে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে তথাকথিত ‘মিলিট্যান্ট সেক্যুলারিজম’ বা উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের চর্চা বেড়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দাড়ি, টুপি বা হিজাবের মতো ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ধর্মীয় বিশ্বাস লালনকারী ব্যক্তিদের মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এমনকি আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান কিংবা আব্দুল মান্নান সৈয়দের মতো বরেণ্য সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরাও কেবল তাদের আদর্শিক অবস্থানের কারণে যথাযথ মূল্যায়ন পাননি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের যে তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে, সেখানে সুকৌশলে ধর্মীয় পরিচিতিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য তার জনগণের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের প্রতিফলন অপরিহার্য। ইউরোপ বা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেসব দেশ তাদের প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলেও বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী মহলের একদেশদর্শী মনোভাবের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এর ফলে সমাজে এক ধরনের নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে।

বিগত বছরগুলোতে ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক বয়ানকে ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তরে ইসলামি চিন্তা ও রাজনীতিকে কোণঠাসা করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। এনজিও এবং নির্দিষ্ট কিছু নাগরিক সংগঠনের মাধ্যমে এই বয়ানকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় জীবনাচরণকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক আচরণ ও ‘সিলেক্টিভ জাস্টিস’ বা পছন্দমাফিক বিচার পদ্ধতি সমাজে দীর্ঘমেয়াদী বিভেদ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল তখনই সম্ভব, যখন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে। ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব পরিহার করে এবং সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা না গেলে এই সংঘাতের আবর্ত থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে। ২০২৪-এর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একটি সংহত রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ইসরাইলের বিভিন্ন স্থানে দ্বিতীয় দিনের মতো ইরানের হামলা

সাংস্কৃতিক সংঘাত ও সেক্যুলার আধিপত্য: বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের গভীরতর বিশ্লেষণ

আপডেট সময় : ০৯:১০:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মূলে কেবল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব নয়, বরং একটি গভীরতর সাংস্কৃতিক সংঘাত বিদ্যমান। রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর থেকেই বাংলাদেশ এক নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, যার ফলে একটি সুসংহত ও স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের নেপথ্যে রয়েছে এ দেশের বুদ্ধিজীবী মহলের একটি বড় অংশের অনুসৃত নীতি, যা সাধারণ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে উপেক্ষা করে এক ধরনের প্রান্তিকীকরণ প্রক্রিয়া জারি রেখেছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এই সংকট নিরসনে নতুন করে পর্যালোচনার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর থেকেই এ অঞ্চলে একটি নির্দিষ্ট বুদ্ধিজীবী শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও আধুনিকায়ন তত্ত্ব দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত ছিল। এই ‘এলিট’ গোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রেই এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দীর্ঘদিনের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় চেতনাকে অস্বীকার করার প্রবণতা দেখিয়েছে। বিশেষ করে, পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণি সেক্যুলারিজমের নামে অনেক সময় ইসলামি মূল্যবোধের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। ফলে সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূলধারা থেকে বিচ্যুত হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে যে, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে তথাকথিত ‘মিলিট্যান্ট সেক্যুলারিজম’ বা উগ্র ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের চর্চা বেড়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দাড়ি, টুপি বা হিজাবের মতো ধর্মীয় প্রতীকগুলোকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং ধর্মীয় বিশ্বাস লালনকারী ব্যক্তিদের মেধা ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এমনকি আল মাহমুদ, সৈয়দ আলী আহসান কিংবা আব্দুল মান্নান সৈয়দের মতো বরেণ্য সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীরাও কেবল তাদের আদর্শিক অবস্থানের কারণে যথাযথ মূল্যায়ন পাননি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের যে তাত্ত্বিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে, সেখানে সুকৌশলে ধর্মীয় পরিচিতিকে বাদ দেওয়া হয়েছে। অথচ একটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য তার জনগণের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের প্রতিফলন অপরিহার্য। ইউরোপ বা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উদাহরণ টেনে বলা হয়, সেসব দেশ তাদের প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রাষ্ট্রীয় দর্শনের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলেও বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবী মহলের একদেশদর্শী মনোভাবের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এর ফলে সমাজে এক ধরনের নৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে।

বিগত বছরগুলোতে ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ের আন্তর্জাতিক বয়ানকে ব্যবহার করে দেশের অভ্যন্তরে ইসলামি চিন্তা ও রাজনীতিকে কোণঠাসা করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। এনজিও এবং নির্দিষ্ট কিছু নাগরিক সংগঠনের মাধ্যমে এই বয়ানকে এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় জীবনাচরণকেও সন্দেহের চোখে দেখা হয়েছে। এই বৈষম্যমূলক আচরণ ও ‘সিলেক্টিভ জাস্টিস’ বা পছন্দমাফিক বিচার পদ্ধতি সমাজে দীর্ঘমেয়াদী বিভেদ ও ঘৃণার জন্ম দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের স্থায়ী সমাধান কেবল তখনই সম্ভব, যখন এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো যাবে। ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব পরিহার করে এবং সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বকে ধারণ করে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করা না গেলে এই সংঘাতের আবর্ত থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন হবে। ২০২৪-এর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। একটি সংহত রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।