ঢাকা ০৩:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ জানুয়ারী ২০২৬

মিয়ানমারের গুলিতে বাংলাদেশি শিশু আহত, টেকনাফ সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা; আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে মানুষ, আটক ৫৩ অনুপ্রবেশকারী

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে এক বাংলাদেশি শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। এই ঘটনার জেরে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এবং তারা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একই সময়ে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে ৫৩ জন মিয়ানমার নাগরিককে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির শব্দে টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার ভোরে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকায়। গুলিবিদ্ধ শিশুটির নাম আফনান (১২) ওরফে পুতুনি। সে লম্বাবিল এলাকার জসিম উদ্দিনের মেয়ে এবং স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে শিশুটি মারা যায়নি।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা কক্সবাজার-টেকনাফ প্রধান সড়কের লম্বাবিল এবং টেচ্ছা ব্রিজ এলাকায় অবরোধ সৃষ্টি করে। এতে প্রায় তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষের কারণে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে ৫৩ জন মিয়ানমার নাগরিক। রবিবার সকালে তাদের টেকনাফ সীমান্ত থেকে আটক করে বিজিবি। বিজিবি আরও জানায়, আটককৃতদের মধ্যে মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য রয়েছে। তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় রয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি, আরসা, আরএসও, নবী হোসেন এবং মাহাজ গ্রুপের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এই গোলাগুলির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে। হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাতভর গোলাগুলির শব্দে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অনেক সীমান্তবাসী, যার ফলে তারা ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। একপর্যায়ে মিয়ানমার দিক থেকে আসা গুলিতে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। এছাড়া মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকালে আটক অর্ধশতাধিক মিয়ানমার নাগরিক পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল বলেন, “মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে এক বাংলাদেশি শিশু আহত হয়েছে। সীমান্তে কয়েকদিন ধরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় পরিস্থিতি থমথমে। অনেকে গুলির ভয়ে পাকা ঘরে আশ্রয় নিচ্ছেন, আবার অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।”

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আমিন জানান, “টানা কয়েকদিন ধরে এই সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি চলছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে রবিবার ভোরে থেমেছে। এতে সীমান্তের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এবং আতঙ্কে জীবন পার করছে। বাংলাদেশি শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা গেছে।”

সামগ্রিকভাবে, টেকনাফ সীমান্ত এখন এক থমথমে পরিস্থিতি পার করছে, যেখানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জনজীবনে।

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে আনসারদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব বজায় রাখার আহ্বান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার

মিয়ানমারের গুলিতে বাংলাদেশি শিশু আহত, টেকনাফ সীমান্তে তীব্র উত্তেজনা; আতঙ্কে ঘর ছাড়ছে মানুষ, আটক ৫৩ অনুপ্রবেশকারী

আপডেট সময় : ০৪:৩৩:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬

কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে এক বাংলাদেশি শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। এই ঘটনার জেরে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে এবং তারা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একই সময়ে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘাত থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে ৫৩ জন মিয়ানমার নাগরিককে আটক করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্তের ওপারে গোলাগুলির শব্দে টেকনাফের হোয়াইক্যং এলাকায় চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

ঘটনাটি ঘটেছে রবিবার ভোরে টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকায়। গুলিবিদ্ধ শিশুটির নাম আফনান (১২) ওরফে পুতুনি। সে লম্বাবিল এলাকার জসিম উদ্দিনের মেয়ে এবং স্থানীয় হাজি মোহাম্মদ হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে শিশুটি মারা যায়নি।

এই খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা কক্সবাজার-টেকনাফ প্রধান সড়কের লম্বাবিল এবং টেচ্ছা ব্রিজ এলাকায় অবরোধ সৃষ্টি করে। এতে প্রায় তিন ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয় এবং যান চলাচল পুনরায় শুরু হয়।

অন্যদিকে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির সঙ্গে অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘর্ষের কারণে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করে ৫৩ জন মিয়ানমার নাগরিক। রবিবার সকালে তাদের টেকনাফ সীমান্ত থেকে আটক করে বিজিবি। বিজিবি আরও জানায়, আটককৃতদের মধ্যে মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্য রয়েছে। তাদের টেকনাফ মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে এবং বর্তমানে তারা পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় রয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি, আরসা, আরএসও, নবী হোসেন এবং মাহাজ গ্রুপের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ চলছে। এই গোলাগুলির প্রভাব সরাসরি পড়ছে বাংলাদেশের টেকনাফ সীমান্তে। হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাতভর গোলাগুলির শব্দে স্থানীয়দের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অনেক সীমান্তবাসী, যার ফলে তারা ঘর ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “হোয়াইক্যং সীমান্তের ওপারে রাতভর গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। একপর্যায়ে মিয়ানমার দিক থেকে আসা গুলিতে এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। এছাড়া মিয়ানমার থেকে অনুপ্রবেশকালে আটক অর্ধশতাধিক মিয়ানমার নাগরিক পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”

হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শাহ জালাল বলেন, “মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে এক বাংলাদেশি শিশু আহত হয়েছে। সীমান্তে কয়েকদিন ধরে গুলিবর্ষণের ঘটনায় পরিস্থিতি থমথমে। অনেকে গুলির ভয়ে পাকা ঘরে আশ্রয় নিচ্ছেন, আবার অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।”

স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আমিন জানান, “টানা কয়েকদিন ধরে এই সীমান্তের ওপারে গোলাগুলি চলছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে শুরু হয়ে রবিবার ভোরে থেমেছে। এতে সীমান্তের মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে এবং আতঙ্কে জীবন পার করছে। বাংলাদেশি শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা গেছে।”

সামগ্রিকভাবে, টেকনাফ সীমান্ত এখন এক থমথমে পরিস্থিতি পার করছে, যেখানে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের জনজীবনে।