আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এক নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় ফেরার লড়াই, অন্যদিকে দলের ভেতরে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের লাগামহীন উপস্থিতি—এই দ্বিমুখী চাপে বিএনপি এখন দিশেহারা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য ও দলীয় সূত্র অনুযায়ী, বিএনপির ১৯০ জন বিদ্রোহী নেতা দেশের ১১৫টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে এমন অনেক আসন রয়েছে যেগুলো বিএনপির চিরচেনা ‘ভোট ব্যাংক’ হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিদ্রোহীরা শেষ পর্যন্ত বিএনপির জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে উঠতে পারে, যা ঐতিহ্যগত ভোট দুই ভাগে বিভক্ত করে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোকে (বিশেষ করে জামায়াত ও এনসিপি জোট) একচেটিয়া সুবিধা এনে দিতে পারে।
বিদ্রোহীদের দমন করতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছেন। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির ৯ জন হেভিওয়েট নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছেন সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২), ঢাকা উত্তর সিটির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব (ঢাকা-১২), এবং সিলেটের মামুনুর রশীদ (সিলেট-৫)। বহিষ্কৃত অন্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন, মোহাম্মদ শাহ আলম, হাসান মামুন ও আব্দুল খালেক। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, জোটের শরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।
বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল কেবল দলের ক্ষতি করছে না, বরং জোটসঙ্গীদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। জোটের কৌশল অনুযায়ী বিএনপি বেশ কিছু আসন শরিকদের জন্য ছেড়ে দিলেও সেখানে বিএনপির বিদ্রোহীরা দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ:
- ঢাকা-১২: জোট প্রার্থী সাইফুল হকের (বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি) বিপরীতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা সাইফুল আলম নীরব।
- ভোলা-১: বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থের বিপরীতে লড়ছেন বিএনপির গোলাম নবী আলমগীর।
- ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২: জামিয়াত উলামায়ে ইসলামের মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিবের বিপরীতে মাঠে আছেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা।
- পটুয়াখালী-৩: গণঅধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরের আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন বিএনপি নেতা হাসান মামুন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগ বিহীন এই নির্বাচনে মূল লড়াই এখন জাতীয়তাবাদী ও ইসলামি ঘরানার দলগুলোর মধ্যে। এই পরিস্থিতিতে বিএনপির ভোট ব্যাংক বিভক্ত হওয়া মানেই হলো জামায়াত-এনসিপি জোটের পথ প্রশস্ত হওয়া। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারেক রহমান কড়া নির্দেশ দিয়েছেন যে, ২০ জানুয়ারি মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ তারিখের মধ্যে যারা সরে দাঁড়াবেন না, তাদের প্রাথমিক সদস্যপদ চিরতরে বাতিল করা হবে। অন্যদিকে, বহিষ্কৃত নেতারা দাবি করছেন, তৃণমূলের মানুষের চাপ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণেই তারা প্রার্থী হতে বাধ্য হয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ২০ জানুয়ারির মধ্যে এই ‘বিদ্রোহী দাবানল’ বিএনপি কতটা নেভাতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে ত্রয়োদশ সংসদে দলটির আসন সংখ্যা।
রিপোর্টারের নাম 

























