দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক দীর্ঘস্থায়ী বরফ গলার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। গত ৩০ ডিসেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে তাঁর বৈঠকটি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কালো পোশাকে শোকাতুর জয়শঙ্কর কেবল নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তাই পৌঁছে দেননি, বরং এক্সে (সাবেক টুইটার) করা তাঁর মন্তব্যটি ছিল নজিরবিহীন। জয়শঙ্কর লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি ও মূল্যবোধ আমাদের দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে পথ দেখাবে’—যাকে বিশ্লেষকরা বিএনপির সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
আলজাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দেড় দশক ধরে ভারত শেখ হাসিনাকে একতরফা সমর্থন দিয়ে আসলেও চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নয়াদিল্লি এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে কার্যকরী সম্পর্ক স্থাপনে আগ্রহী। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপির নির্বাচনী জোট ভেঙে যাওয়া এবং তারেক রহমানের সাম্প্রতিক ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ’ ও ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা’ সংক্রান্ত বার্তাগুলো নয়াদিল্লির কাছে ইতিবাচক হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা মনে করেন, দীর্ঘ প্রবাস জীবন তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি পরিণত করেছে এবং তিনি বুঝতে পারছেন যে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য ভারতের সঙ্গে বৈরিতা নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মাঠের প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট। দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ছাত্র বিপ্লবী এবং জামায়াতে ইসলামীর ক্রমবর্ধমান শক্তির বিপরীতে তারেক রহমানই এখন ভারতের কাছে ‘সবচেয়ে নিরাপদ বাজি’। তবে সম্পর্কের এই জোড়াতালি কেবল ছবি বা করমর্দনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুটি বিএনপির জন্য একটি বড় পরীক্ষা হবে। তারেক রহমানের উপদেষ্টা হুমায়ূন কবির স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে চাপ দেওয়া হবে।
ভারতের এই নীতি পরিবর্তন কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল এবং পরবর্তী দ্বিপাক্ষিক পদক্ষেপের ওপর। শ্রিংলা ও ড্যানিলোভিচের মতো কূটনীতিকদের মতে, ভারত এখন তার আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির ওপর বেশি ভরসা করতে চায়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে থাকা ভারতবিরোধী মনোভাব প্রশমিত করতে নয়াদিল্লি সত্যিই শেখ হাসিনার বদলে ‘রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র’ সম্পর্কে আন্তরিক কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রিপোর্টারের নাম 

























