বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন মানেই ছিল আনন্দ ও উৎসবের নাম। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে এই উৎসবের আমেজ অনেকটা ফিকে হয়ে গিয়েছিল, যেখানে ভোটারদের ইচ্ছার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণই ছিল মুখ্য। ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন, যা গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশ এখন এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নতুন করে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। ভোটারদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে বহু বছরের হারানো ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের স্বস্তি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও তৈরি হয়েছে সত্যিকারের প্রতিযোগিতার মানসিকতা।
এবারের নির্বাচনে প্রায় ১২ কোটি ৭৬ লাখ ভোটার অংশগ্রহণ করছেন, যার মধ্যে ৪৪ লাখেরও বেশি নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছেন। দীর্ঘদিন পর একটি বহুদলীয় ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এবারের ভোটের অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ‘গণভোট’ অনুষ্ঠিত হবে। প্রার্থীরা এখন কেবল দলীয় প্রতীকের ওপর ভরসা না করে ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘদিনের একতরফা নির্বাচনের সংস্কৃতিকে ভেঙে পুরোনো দিনের রাজনৈতিক আমেজ ফিরিয়ে এনেছে। সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এই নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের অনিশ্চয়তা নেই এবং একটি স্বচ্ছ ও উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ তাদের রায় প্রদান করতে পারবে।
তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে নির্বাচনের প্রচারণায় যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। প্রার্থীরা এখন কেবল উঠান বৈঠক বা মিছিল-মিটিংয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ফেসবুক, ইউটিউব ও বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তারা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দিয়ে টিম গঠন করে প্রার্থীরা ভিডিও বার্তা ও লাইভ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। এমনকি প্রবাসীদের ভোট প্রাপ্তিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এবারই প্রথম প্রবাসীরা ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ পেয়েছেন এবং ইতিমধ্যে প্রায় ১৩ লাখেরও বেশি ভোটার ডাকযোগের মাধ্যমে ভোট দিতে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এই আধুনিকায়ন নির্বাচনকে আরও অংশগ্রহণমূলক করে তুলেছে, যদিও এর পাশাপাশি গুজব ও অপপ্রচার রোধে সাইবার নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে।
নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পরিবর্তনের জন্য নয়, বরং ভেঙে পড়া অর্থনীতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধারের জন্যও অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠন হলে তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে বিনিয়োগকারীরা আশা করছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো আরও গতিশীল হবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে। ২০২৬ সাল তাই বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নির্বাচনের বছর নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ার বছরের নাম। সকলের প্রত্যাশা, ১২ ফেব্রুয়ারির এই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে নতুন দিনের যাত্রা শুরু করবে।
রিপোর্টারের নাম 

























