বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন কেবল একজন নেতার ঘরে ফেরা নয়, বরং এটি দেশের গভীর রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকট নিরসনের এক নতুন সম্ভাবনা। দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে তিনি এমন এক সময়ে ফিরেছেন, যখন জাতি এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণ পার করছে। ইতিহাস খুব কম ব্যক্তিকেই বারবার নিজেকে প্রমাণের সুযোগ দেয়; তারেক রহমানের সামনে এখন সেই বিরল মুহূর্ত উপস্থিত। ব্যক্তিপূজা বা স্রেফ স্তুতি নয়, বরং বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে তিনি কীভাবে নিজেকে জনগণের কাছে প্রাসঙ্গিক করে তুলবেন এবং রাষ্ট্র সংস্কারে ভূমিকা রাখবেন, সেটিই এখন মুখ্য আলোচনার বিষয়।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তনের ঘটনা নতুন নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিংবা শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন জাতি প্রত্যক্ষ করেছে। তবে নেতার প্রত্যাবর্তন মানেই যে নিশ্চিত সাফল্য, ইতিহাস তা বলে না। শেখ হাসিনার বিগত শাসনামল এর বড় উদাহরণ। ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব তাঁকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিল, যার ফলে রাষ্ট্রযন্ত্রের অপব্যবহার ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার মতো আত্মঘাতী পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। জনগণের আস্থার পরিবর্তে দমন-পীড়নের ওপর ভিত্তি করে গড়া সেই শাসনব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত টেকসই হয়নি। এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে নতুন নেতৃত্বকে শিক্ষা নিতে হবে যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী কোনো অধিকার নয়, বরং জনগণের দেওয়া একটি সাময়িক আমানত মাত্র।
তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁর জন্য একটি বড় সম্পদ হতে পারে। তিনি যুক্তরাজ্যের মতো একটি উন্নত গণতান্ত্রিক দেশের শাসনব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন খুব কাছ থেকে দেখেছেন। উন্নত বিশ্বে ব্যক্তি নয়, বরং প্রতিষ্ঠানই সব ক্ষমতার উৎস। সেই অভিজ্ঞতা যদি তিনি কেবল বক্তৃতার স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় প্রয়োগ করতে পারেন, তবে তা দেশ পরিচালনায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। তবে এক্ষেত্রে অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রয়োগের দিকেই নজর দিতে হবে।
রাজনীতিতে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের অন্যতম শর্ত হলো অতীতের ভুলভ্রান্তি স্বীকার করে নেওয়া। অতীতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর কোনো ভুল সিদ্ধান্ত থাকলে, তা অকপটে স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইলে তা তাঁর মর্যাদা কমাবে না; বরং নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া, আমাদের রাজনীতির চিরচেনা সমস্যা ‘তেলবাজ ও সুবিধাবাদী’ শ্রেণি থেকে তাঁকে সতর্ক থাকতে হবে। অতীতে যারা শেখ হাসিনাকে মিথ্যে স্তুতিতে ভাসিয়ে জনবিচ্ছিন্ন করেছিলেন, বর্তমানে তাঁদেরই একটি অংশ তারেক রহমানকে নিয়ে অতি-উৎসাহ দেখাতে শুরু করেছেন। এমনকি যেসব গণমাধ্যম একসময় তাঁকে ‘দুর্নীতির বরপুত্র’ আখ্যা দিয়েছিল, আজ তারাই তাঁর বন্দনায় লিপ্ত। এই সুবিধাবাদীদের অতিরঞ্জিত প্রচারণা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে নিজস্ব বিবেক ও তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হবে বিচক্ষণ নেতৃত্বের পরিচয়।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও তারেক রহমানকে দূরদর্শিতার পরিচয় দিতে হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। একতরফা নির্ভরশীলতা কখনোই সার্বভৌমত্বের জন্য কল্যাণকর নয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রমাণ করেছে যে, জাতীয় স্বার্থ অটুট রেখেও আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার নামে জনবিচ্ছিন্নতাও কাম্য নয়। নিরাপত্তার বেড়াজালে তিনি যদি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যান, তবে দলের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগ সন্ধানীরা সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে। যেমনটি ইতিমধ্যে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির মনোনয়ন লাভের গুঞ্জন বা সোশ্যাল মিডিয়ার সমালোচনায় স্পষ্ট হচ্ছে।
পরিশেষে, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান একটি বার্তা পরিষ্কার করে দিয়েছে—জনসমর্থন ছাড়া কোনো সরকারই টিকে থাকতে পারে না। বাইরের কোনো শক্তির সমর্থন বা পেশ পেশিশক্তি দিয়ে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার দিন শেষ। দেশের তরুণ সমাজ যে গণজাগরণ ঘটিয়েছে, তার রেশ কয়েক দশক থাকবে। তাই ভোটের আগেই নিজেকে বিজয়ী ভাবার আত্মতুষ্টি রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হতে পারে। তারেক রহমানের সামনে এখন নিজের এবং তাঁর পূর্বসূরিদের সম্মানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ এসেছে। এই সুযোগকে যদি তিনি দেশপ্রেম, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজে লাগাতে পারেন, তবেই তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সার্থকতা পাবে এবং ইতিহাসে তিনি এক মহানায়ক হিসেবে স্থান করে নেবেন।
রিপোর্টারের নাম 

























