বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসলামপন্থী চরমপন্থার দৃশ্যমান বিস্তার এবং বিচারবহির্ভূত সহিংসতার ঘটনাগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি কৌশলগত সতর্কতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে। ইতালীয় ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ সার্জিও রেস্টেলি ‘টাইমস অফ ইসরায়েল’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে দাবি করেছেন যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ধর্মীয় কট্টরপন্থা মূলধারায় চলে আসছে, যা ইউরোপীয় শহর এবং বিশ্বজুড়ে ইসরায়েলি ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনের মূল বিষয়বস্তু ও বৈশ্বিক প্রভাব সার্জিও রেস্টেলির মতে, বাংলাদেশ বর্তমানে এক বিপজ্জনক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনি এবং ধর্মনিরপেক্ষ কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রবণতা একটি আদর্শিক ইকোসিস্টেম তৈরি করছে। এটি কেবল বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর সাথে বৈশ্বিক জিহাদি আখ্যানের যোগসূত্র তৈরি হচ্ছে যা পশ্চিমবিরোধী এবং ইসরায়েল-বিদ্বেষী। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই চরমপন্থা ইউরোপের দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পরিসংখ্যান ও সাম্প্রতিক অস্থিরতা ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে নিরাপত্তা ও ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এসেছে:
- সংখ্যালঘু নির্যাতন: হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনোরিটিস (HRCBM) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে হিন্দু সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অন্তত ৭১টি ধর্ম অবমাননা সংক্রান্ত সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
- দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ড: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস (৩০) নামে এক হিন্দু শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
- গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা: ২০২৫ সালের ১৮-২০ ডিসেম্বর সময়ে ওসমাণ হাদীর মৃত্যুর পর ইনকিলাব মঞ্চের সমর্থকদের দ্বারা প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, ছায়ানট এবং উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে।
- নিরাপত্তা ঝুঁকি: ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত কারাগার থেকে পলাতক ৭০০-এর বেশি বন্দির মধ্যে অন্তত ৭০ জন দুর্ধর্ষ জঙ্গি সদস্য রয়েছে। এছাড়া থানা থেকে লুট হওয়া প্রায় ৫,৮০০ অস্ত্র এবং ৩ লাখ রাউন্ড গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
রাজনৈতিক মেরুকরণ ও ভবিষ্যৎ প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলোর রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে (যেমন সঙ্গীত বা নারী ফুটবল) বিধিনিষেধ আরোপের দাবি চরমপন্থাকে সামাজিক বৈধতা দিচ্ছে। যদিও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে, তবে অর্থনৈতিক মন্দা (জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩-৪% এ নেমে আসা) এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সামনে রেখে এই অস্থিতিশীলতা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিপোর্টারের নাম 





















