ঢাকা ০৬:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬

শোকাহত ফ্রান্স: প্রয়াত ‘যৌন মুক্তি’র প্রতীক

ফরাসি সিনেমার এক অনন্য নক্ষত্র, সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং এক সময়ের ইউরোপজুড়ে আলোড়ন তোলা ব্যক্তিত্ব ব্রিজিত বার্দো আর নেই। ২৮ ডিসেম্বর তিনি ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৫০ ও ৬০–এর দশকে ফরাসি সিনেমার পর্দায় বার্দোর উপস্থিতি ছিল যুগান্তকারী। ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’–এর মতো ছবিতে তার অভিনয় তাকে শুধু চলচ্চিত্রতারকাই নয়, বরং বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যৌন মুক্তি আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

মাত্র ৩৯ বছর বয়সে, প্রায় ৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর তিনি স্বেচ্ছায় রুপালি পর্দা থেকে সরে দাঁড়ান। তখনই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন তার বহুল উদ্ধৃত ঘোষণা- ‘আমি আমার যৌবন ও সৌন্দর্য মানুষকে দিয়েছি, এখন আমার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দেব প্রাণীদের।’

এরপর জীবনের বাকি সময়টা তিনি ব্যয় করেন প্রাণী অধিকার আন্দোলনে, প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বার্দোর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি ছিলেন এক অনন্য ফরাসি অস্তিত্ব, এক সর্বজনীন দীপ্তি। তিনি আমাদের ছুঁয়ে গেছেন। আমরা এক শতাব্দীর কিংবদন্তিকে হারালাম।’

ফ্রান্সজুড়ে টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো তাদের স্বাভাবিক অনুষ্ঠানসূচি বাতিল করে বার্দোর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশেষ সম্প্রচার শুরু করেছে।

বিতর্কে ঘেরা উত্তরজীবন

বার্দোর জীবন কেবল গৌরবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার উত্তরাধিকার জটিল ও বিতর্কিত।

২০০৮ সালে তিনি পঞ্চমবারের মতো জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার দায়ে দণ্ডিত হন। নিজের ওয়েবসাইটে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে তিনি বলেছিলেন, মুসলমানরা নাকি নিজেদের রীতিনীতি চাপিয়ে দিয়ে তাদের দেশ ধ্বংস করছে।

২০১৮ সালে #মিঠু আন্দোলন নিয়ে তার মন্তব্যও তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এসব কারণে শেষ জীবনে তিনি ফরাসি সমাজের একাংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।ব্রিজিত বার্দোব্রিজিত বার্দো তবু, ভালোবাসা রয়ে গেছে

সব বিতর্ক সত্ত্বেও বার্দোর প্রতি ভালোবাসা মুছে যায়নি। দক্ষিণ ফ্রান্সের সাঁ-ত্রোপে, যেখানে তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন, সেখানে অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন ভক্তরা।

সিলভিয়া নামের এক সুইস নাগরিক তাকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমি তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতাম ও শ্রদ্ধা করতাম। প্রাণীদের জন্য তার লড়াই সত্যিই সম্মানজনক।’

আরেক ভক্ত সান্দ্রিন বলেন, ‘তিনি স্বাধীনতার প্রতীক। ভালোবাসার স্বাধীনতা, নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতার প্রতীক।’

‘যৌন মুক্তি’র প্রতীক

১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এই সময়টাকে ইউরোপীয় ইতিহাসে যৌন দৃষ্টিভঙ্গির বড় পরিবর্তনের যুগ বলা হয়। এই সময়েই যৌনতা বিবাহ ও প্রজননের সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটেই বার্দোর চলচ্চিত্রগুলো আলোড়ন তোলে। ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’–এ তিনি এমন এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি পুরুষদের মতোই নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশে সংকোচহীন।

এমনকি অভিনয়ে আসার আগেই বিকিনি পরিহিত ছবি তুলে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। যে পোশাক তখন স্পেন ও ইতালিতে অশালীন বলে নিষিদ্ধ ছিল।

ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়া তাকে অভিহিত করেছিলেন ‘পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার প্রতিমূর্তি’ হিসেবে।ব্রিজিত বার্দোব্রিজিত বার্দো ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েন

বার্দো চারবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথম বিয়ে করেন ১৮ বছর বয়সে পরিচালক রজার ভাদিমকে। দ্বিতীয় স্বামী অভিনেতা জাক শারিয়ে। এই সংসারেই তার একমাত্র সন্তান নিকোলাস জন্ম নেন।

তবে মাতৃত্বকে তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। আত্মজীবনীতে লেখা মন্তব্যের জন্য পরে ছেলে নিকোলাস তার বিরুদ্ধে মানসিক ক্ষতির মামলা করেন।

শেষ জীবনে তিনি বিবাহিত ছিলেন বার্নার দ’অরমাল–এর সঙ্গে, যিনি ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

প্রাণীদের ‘দূত’

প্রাণী অধিকার সংগঠন পেটা’র প্রতিষ্ঠাতা ইনগ্রিড নিউকার্ক বলেন, ‘বার্দো ছিলেন প্রাণীদের জন্য এক দেবদূত।’

ব্রিজিত বার্দো ছিলেন একই সঙ্গে আলো ও ছায়ার মানুষ। তিনি যেমন ছিলেন সিনেমার ইতিহাসে এক বিপ্লবী উপস্থিতি, তেমনি তার রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য তাকে বিতর্কিতও করেছে।

সূত্র: বিবিসি

ট্যাগস :
আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

উখিয়ায় সংরক্ষিত বনভূমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের মহোৎসব

শোকাহত ফ্রান্স: প্রয়াত ‘যৌন মুক্তি’র প্রতীক

আপডেট সময় : ০৩:০৫:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫

ফরাসি সিনেমার এক অনন্য নক্ষত্র, সাংস্কৃতিক প্রতীক এবং এক সময়ের ইউরোপজুড়ে আলোড়ন তোলা ব্যক্তিত্ব ব্রিজিত বার্দো আর নেই। ২৮ ডিসেম্বর তিনি ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

১৯৫০ ও ৬০–এর দশকে ফরাসি সিনেমার পর্দায় বার্দোর উপস্থিতি ছিল যুগান্তকারী। ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’–এর মতো ছবিতে তার অভিনয় তাকে শুধু চলচ্চিত্রতারকাই নয়, বরং বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যৌন মুক্তি আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

মাত্র ৩৯ বছর বয়সে, প্রায় ৫০টি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের পর তিনি স্বেচ্ছায় রুপালি পর্দা থেকে সরে দাঁড়ান। তখনই তিনি উচ্চারণ করেছিলেন তার বহুল উদ্ধৃত ঘোষণা- ‘আমি আমার যৌবন ও সৌন্দর্য মানুষকে দিয়েছি, এখন আমার প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতা দেব প্রাণীদের।’

এরপর জীবনের বাকি সময়টা তিনি ব্যয় করেন প্রাণী অধিকার আন্দোলনে, প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বার্দোর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি ছিলেন এক অনন্য ফরাসি অস্তিত্ব, এক সর্বজনীন দীপ্তি। তিনি আমাদের ছুঁয়ে গেছেন। আমরা এক শতাব্দীর কিংবদন্তিকে হারালাম।’

ফ্রান্সজুড়ে টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো তাদের স্বাভাবিক অনুষ্ঠানসূচি বাতিল করে বার্দোর জীবন ও কর্ম নিয়ে বিশেষ সম্প্রচার শুরু করেছে।

বিতর্কে ঘেরা উত্তরজীবন

বার্দোর জীবন কেবল গৌরবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার উত্তরাধিকার জটিল ও বিতর্কিত।

২০০৮ সালে তিনি পঞ্চমবারের মতো জাতিগত বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার দায়ে দণ্ডিত হন। নিজের ওয়েবসাইটে মুসলমানদের বিরুদ্ধে মন্তব্য করে তিনি বলেছিলেন, মুসলমানরা নাকি নিজেদের রীতিনীতি চাপিয়ে দিয়ে তাদের দেশ ধ্বংস করছে।

২০১৮ সালে #মিঠু আন্দোলন নিয়ে তার মন্তব্যও তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। এসব কারণে শেষ জীবনে তিনি ফরাসি সমাজের একাংশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।ব্রিজিত বার্দোব্রিজিত বার্দো তবু, ভালোবাসা রয়ে গেছে

সব বিতর্ক সত্ত্বেও বার্দোর প্রতি ভালোবাসা মুছে যায়নি। দক্ষিণ ফ্রান্সের সাঁ-ত্রোপে, যেখানে তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন, সেখানে অশ্রুসিক্ত শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন ভক্তরা।

সিলভিয়া নামের এক সুইস নাগরিক তাকে বিদায় জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমি তাকে গভীরভাবে ভালোবাসতাম ও শ্রদ্ধা করতাম। প্রাণীদের জন্য তার লড়াই সত্যিই সম্মানজনক।’

আরেক ভক্ত সান্দ্রিন বলেন, ‘তিনি স্বাধীনতার প্রতীক। ভালোবাসার স্বাধীনতা, নিজেকে প্রকাশ করার স্বাধীনতার প্রতীক।’

‘যৌন মুক্তি’র প্রতীক

১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এই সময়টাকে ইউরোপীয় ইতিহাসে যৌন দৃষ্টিভঙ্গির বড় পরিবর্তনের যুগ বলা হয়। এই সময়েই যৌনতা বিবাহ ও প্রজননের সীমা ছাড়িয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতার অংশ হয়ে ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটেই বার্দোর চলচ্চিত্রগুলো আলোড়ন তোলে। ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড ওমেন’–এ তিনি এমন এক নারীর চরিত্রে অভিনয় করেন, যিনি পুরুষদের মতোই নিজের যৌন আকাঙ্ক্ষা প্রকাশে সংকোচহীন।

এমনকি অভিনয়ে আসার আগেই বিকিনি পরিহিত ছবি তুলে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। যে পোশাক তখন স্পেন ও ইতালিতে অশালীন বলে নিষিদ্ধ ছিল।

ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়া তাকে অভিহিত করেছিলেন ‘পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতার প্রতিমূর্তি’ হিসেবে।ব্রিজিত বার্দোব্রিজিত বার্দো ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েন

বার্দো চারবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রথম বিয়ে করেন ১৮ বছর বয়সে পরিচালক রজার ভাদিমকে। দ্বিতীয় স্বামী অভিনেতা জাক শারিয়ে। এই সংসারেই তার একমাত্র সন্তান নিকোলাস জন্ম নেন।

তবে মাতৃত্বকে তিনি গ্রহণ করতে পারেননি। আত্মজীবনীতে লেখা মন্তব্যের জন্য পরে ছেলে নিকোলাস তার বিরুদ্ধে মানসিক ক্ষতির মামলা করেন।

শেষ জীবনে তিনি বিবাহিত ছিলেন বার্নার দ’অরমাল–এর সঙ্গে, যিনি ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

প্রাণীদের ‘দূত’

প্রাণী অধিকার সংগঠন পেটা’র প্রতিষ্ঠাতা ইনগ্রিড নিউকার্ক বলেন, ‘বার্দো ছিলেন প্রাণীদের জন্য এক দেবদূত।’

ব্রিজিত বার্দো ছিলেন একই সঙ্গে আলো ও ছায়ার মানুষ। তিনি যেমন ছিলেন সিনেমার ইতিহাসে এক বিপ্লবী উপস্থিতি, তেমনি তার রাজনৈতিক অবস্থান ও বক্তব্য তাকে বিতর্কিতও করেছে।

সূত্র: বিবিসি