ঢাকা ১০:০৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভালো দামের আশায় আগাম আলু চাষে ব্যস্ত নীলফামারীর কৃষক

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ১১:১৪:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

আলুর ভান্ডার হিসেবে পরিচিত নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলা। বর্তমানে এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ভালো দাম পাওয়ার আশায় উঁচু সমতল জমিতে স্থানীয় কৃষকরা মাঠের পর মাঠ ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফলনযোগ্য সেভেন জাতের আলুর বীজ রোপণ করছেন।

এখানকার কৃষকরা আশা করছেন, মৌসুমের প্রথম দিকে অর্থাৎ ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এই আলু উৎপাদন করতে পারলে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাবে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আগাম ধান কেটে কৃষকেরা সেই জমিতে সেভেন জাতের আলু ছাড়াও গ্র্যানুল্যা, সাকিতা, কারেজ এবং জামপ্লাস আলু রোপণ করছেন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, স্বল্পমেয়াদী আউশ বা আগাম জাতের ধান কাটা-মাড়াই শেষ করে কৃষকরা এখন ওই জমিতে সেভেন জাতের আলু রোপণের জন্য হিমাগার থেকে বীজ সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি চলছে জমি হাল চাষ, আগাছা পরিষ্কার, সেচের জন্য ক্যানেল তৈরি এবং জৈব সার প্রয়োগের কাজ।

স্থানীয় আলু চাষি আব্দুর রহমান জানান, যদি আবহাওয়া ঠিক থাকে, তাহলে নতুন আলু বাজারে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। সেই সময় বাজারে এর চাহিদা অনেক বেশি থাকে। ঢাকার বড় বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে অগ্রিম বায়না করেন এবং পরে মাঠ থেকে ট্রাকে করে আলু নিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা খরচ হয়, সেখানে নতুন আলু বিক্রি হবে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এর ফলে প্রতি কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা লাভ হবে।

কৃষিনির্ভর উত্তরের জেলা নীলফামারীর মধ্যে কিশোরগঞ্জ উপজেলা আলু চাষের জন্য সারা দেশে সুপরিচিত। এখানকার মাটি দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ হওয়ার কারণে বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি আলু এখানে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ফসল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে মাঠে মাঠে আলুর বীজ বপন ও জমি তৈরির কাজ চলছে। কৃষি শ্রমিকরাও অলস বসে নেই। ফলে শ্রমিকের চাহিদা ও মজুরি দুটোই বেড়েছে। নারী-পুরুষ উভয়েই সমানতালে আলু রোপণের কাজ করছেন।

উপজেলার রণচন্ডী ইউনিয়নের কুটিপাড়া গ্রামের কৃষক রহিদুল ইসলাম জানান, গত বছর তিনি উঁচু জমিতে দেড় বিঘা জমির আলু ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে খরচ বাদে অর্ধেক টাকা লাভ করেছিলেন। এবারও বেশি লাভের আশায় তিনি আড়াই বিঘা (৮০ শতাংশ) জমিতে ৫৫ দিনে উত্তোলনযোগ্য সেভেন জাতের আলুর বীজ রোপণ করছেন। তিনি আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও লাভবান হতে পারবেন।

একই উপজেলার বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি গ্রামের কৃষক রশিদুল ইসলাম ১৬ বিঘা (৪৮০ শতাংশ) জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করেছেন। তিনি মনে করেন, যার আলু যত আগে বাজারে উঠবে, তার লাভ তত বেশি হবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আগাম আলু চাষে কৃষকের কোনো লোকসান বা ক্ষতির আশঙ্কা নেই। এখানকার জমি উঁচু ও বালু মিশ্রিত হওয়ায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এই চাষে ক্ষতির ভয় কম। তিনি আরও বলেন, বাজারে ভালো দাম পেলে আলু বিক্রি করে গত বছরের লোকসানও পুষিয়ে লাভবান হওয়া যাবে।

একই গ্রামের কৃষক আসাদুল হক জানান, কৃষিই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। তিনি গত বছরও সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছিলেন। প্রথমদিকে কিছুটা লাভ হলেও পরে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কিছুটা লোকসান হয়েছিল। তারপরও এবার লাভের আশায় তিনি আলু রোপণ করেছেন এবং আশা করছেন গত বছরের লোকসান পুষিয়ে লাভবান হতে পারবেন।

আলু চাষি মজিবর রহমান জানান, তিনি হিমাগার থেকে ২৩০ বস্তা আলু এনে সাড়ে ১২ বিঘা জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করেছেন। বাকি আলু বাজারে প্রতি কেজি ১৮ থেকে ২০ টাকা দরে বীজ হিসেবে বিক্রি করছেন। উৎপাদন খরচ অনুযায়ী প্রতি কেজি আলুর দাম পড়েছে ৩০ টাকা। বাজার খারাপ হওয়ায় কেজিতে তার ১০ থেকে ১২ টাকা লোকসান হয়েছে। তারপরও লাভের আশায় তিনি এই পরিমাণ জমিতে আলু লাগিয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, চলতি মৌসুমে তিন হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৫ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করা হয়েছে। আগাম জাতের ধান কেটে কৃষকরা এখন আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উঁচু বেলে, দোঁআশ ও দোঁআশ মাটিতে আলু চাষের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান জানান, জেলায় এ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে প্রায় ৩৫ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করেছেন কৃষক। আলুর ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ। গত বছর জেলায় ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছিল। এবার চলতি মৌসুমে আগাম জাতের আলু ৮ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কৃষি বিভাগ মাঠে কাজ করছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

শ্রীপুরে ১২ বিঘার সূর্যমুখী বাগান: কৃষি ও পর্যটনে নতুন দিগন্ত

ভালো দামের আশায় আগাম আলু চাষে ব্যস্ত নীলফামারীর কৃষক

আপডেট সময় : ১১:১৪:০৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৫

আলুর ভান্ডার হিসেবে পরিচিত নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলা। বর্তমানে এখানকার বিস্তীর্ণ মাঠে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। ভালো দাম পাওয়ার আশায় উঁচু সমতল জমিতে স্থানীয় কৃষকরা মাঠের পর মাঠ ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে ফলনযোগ্য সেভেন জাতের আলুর বীজ রোপণ করছেন।

এখানকার কৃষকরা আশা করছেন, মৌসুমের প্রথম দিকে অর্থাৎ ৫৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এই আলু উৎপাদন করতে পারলে বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাবে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আগাম ধান কেটে কৃষকেরা সেই জমিতে সেভেন জাতের আলু ছাড়াও গ্র্যানুল্যা, সাকিতা, কারেজ এবং জামপ্লাস আলু রোপণ করছেন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, স্বল্পমেয়াদী আউশ বা আগাম জাতের ধান কাটা-মাড়াই শেষ করে কৃষকরা এখন ওই জমিতে সেভেন জাতের আলু রোপণের জন্য হিমাগার থেকে বীজ সংগ্রহ করছেন। পাশাপাশি চলছে জমি হাল চাষ, আগাছা পরিষ্কার, সেচের জন্য ক্যানেল তৈরি এবং জৈব সার প্রয়োগের কাজ।

স্থানীয় আলু চাষি আব্দুর রহমান জানান, যদি আবহাওয়া ঠিক থাকে, তাহলে নতুন আলু বাজারে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হতে পারে। সেই সময় বাজারে এর চাহিদা অনেক বেশি থাকে। ঢাকার বড় বড় পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে অগ্রিম বায়না করেন এবং পরে মাঠ থেকে ট্রাকে করে আলু নিয়ে যান। তিনি আরও বলেন, প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা খরচ হয়, সেখানে নতুন আলু বিক্রি হবে ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। এর ফলে প্রতি কেজিতে ৫০ থেকে ৬০ টাকা লাভ হবে।

কৃষিনির্ভর উত্তরের জেলা নীলফামারীর মধ্যে কিশোরগঞ্জ উপজেলা আলু চাষের জন্য সারা দেশে সুপরিচিত। এখানকার মাটি দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ হওয়ার কারণে বিভিন্ন ফসলের পাশাপাশি আলু এখানে একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য ফসল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে মাঠে মাঠে আলুর বীজ বপন ও জমি তৈরির কাজ চলছে। কৃষি শ্রমিকরাও অলস বসে নেই। ফলে শ্রমিকের চাহিদা ও মজুরি দুটোই বেড়েছে। নারী-পুরুষ উভয়েই সমানতালে আলু রোপণের কাজ করছেন।

উপজেলার রণচন্ডী ইউনিয়নের কুটিপাড়া গ্রামের কৃষক রহিদুল ইসলাম জানান, গত বছর তিনি উঁচু জমিতে দেড় বিঘা জমির আলু ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করে খরচ বাদে অর্ধেক টাকা লাভ করেছিলেন। এবারও বেশি লাভের আশায় তিনি আড়াই বিঘা (৮০ শতাংশ) জমিতে ৫৫ দিনে উত্তোলনযোগ্য সেভেন জাতের আলুর বীজ রোপণ করছেন। তিনি আশা করছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবারও লাভবান হতে পারবেন।

একই উপজেলার বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি গ্রামের কৃষক রশিদুল ইসলাম ১৬ বিঘা (৪৮০ শতাংশ) জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করেছেন। তিনি মনে করেন, যার আলু যত আগে বাজারে উঠবে, তার লাভ তত বেশি হবে। আবহাওয়া ভালো থাকলে আগাম আলু চাষে কৃষকের কোনো লোকসান বা ক্ষতির আশঙ্কা নেই। এখানকার জমি উঁচু ও বালু মিশ্রিত হওয়ায় বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে এই চাষে ক্ষতির ভয় কম। তিনি আরও বলেন, বাজারে ভালো দাম পেলে আলু বিক্রি করে গত বছরের লোকসানও পুষিয়ে লাভবান হওয়া যাবে।

একই গ্রামের কৃষক আসাদুল হক জানান, কৃষিই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস। তিনি গত বছরও সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছিলেন। প্রথমদিকে কিছুটা লাভ হলেও পরে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কিছুটা লোকসান হয়েছিল। তারপরও এবার লাভের আশায় তিনি আলু রোপণ করেছেন এবং আশা করছেন গত বছরের লোকসান পুষিয়ে লাভবান হতে পারবেন।

আলু চাষি মজিবর রহমান জানান, তিনি হিমাগার থেকে ২৩০ বস্তা আলু এনে সাড়ে ১২ বিঘা জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করেছেন। বাকি আলু বাজারে প্রতি কেজি ১৮ থেকে ২০ টাকা দরে বীজ হিসেবে বিক্রি করছেন। উৎপাদন খরচ অনুযায়ী প্রতি কেজি আলুর দাম পড়েছে ৩০ টাকা। বাজার খারাপ হওয়ায় কেজিতে তার ১০ থেকে ১২ টাকা লোকসান হয়েছে। তারপরও লাভের আশায় তিনি এই পরিমাণ জমিতে আলু লাগিয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, চলতি মৌসুমে তিন হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৩৫ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করা হয়েছে। আগাম জাতের ধান কেটে কৃষকরা এখন আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তিনি আরও জানান, বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উঁচু বেলে, দোঁআশ ও দোঁআশ মাটিতে আলু চাষের জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান জানান, জেলায় এ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে প্রায় ৩৫ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করেছেন কৃষক। আলুর ভান্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জ। গত বছর জেলায় ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছিল। এবার চলতি মৌসুমে আগাম জাতের আলু ৮ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কৃষি বিভাগ মাঠে কাজ করছে।