ভেনেজুয়েলাকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে একটি নৌযানে সর্বশেষ হামলায় চারজন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। মার্কিন আইনপ্রণেতারা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রাসন ঠেকাতে আনা প্রস্তাবগুলো নাকচ করার পরই এ হামলার ঘোষণা দেওয়া হলো। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
লাতিন আমেরিকা অঞ্চলে পরিচালিত সাউদার্ন স্পিয়ার সামরিক অভিযানের নেতৃত্বদানকারী মার্কিন সাউদার্ন কমান্ড (সাউথকম) বুধবার জানায়, হামলায় চারজন পুরুষ নার্কো–সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তবে ধ্বংস করা নৌযানটি মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল, এ দাবির পক্ষে কোনও প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
সাউথকম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, নৌযানটি পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের একটি পরিচিত মাদক পাচার রুটে চলাচল করছিল এবং মাদক পাচার কার্যক্রমে যুক্ত ছিল। পোস্টের সঙ্গে দ্রুতগতির একটি নৌকা ধ্বংসের ভিডিওও প্রকাশ করা হয়।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশে চালানো এই হামলায় সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহতের সংখ্যা প্রায় ১০০ জনে পৌঁছেছে। ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি অনুযায়ী, এ সময় ২৬টি নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তুললেও ট্রাম্প এসব হামলাকে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবাহ ঠেকাতে প্রয়োজনীয় বলে ব্যাখ্যা করে আসছেন। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলাভিত্তিক মাদকচক্রগুলোকে লক্ষ্য করেই এ অভিযান।
এ অবস্থায় বুধবার রিপাবলিকান–নিয়ন্ত্রিত মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ ২১৩–২১১ ভোটে এমন একটি প্রস্তাব নাকচ করে, যেখানে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বা ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে চলমান সামরিক তৎপরতা থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার কথা ছিল। একই দিনে ২১৬–২১০ ভোটে আরেকটি প্রস্তাবও বাতিল হয়, যাতে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া পশ্চিম গোলার্ধে প্রেসিডেন্ট মনোনীত কোনও সন্ত্রাসী সংগঠনের বিরুদ্ধে সামরিক তৎপরতা বন্ধের কথা বলা হয়েছিল।
এই প্রস্তাবগুলো নাকচ হওয়ার মধ্যেই লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের সামরিক শক্তি মোতায়েন চলছে। এতে হাজার হাজার সেনা, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বিমানবাহী রণতরি এবং একটি পারমাণবিকচালিত সাবমেরিন যুক্ত রয়েছে। একই সময়ে ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে সরাতে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বন্দরে যাতায়াতকারী সব নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর নৌ অবরোধের নির্দেশ দেন। মাদুরোর সরকার একে কুৎসিত হুমকি আখ্যা দিয়ে বলেছে, এর উদ্দেশ্য ভেনেজুয়েলার সম্পদ চুরি করা। গত সপ্তাহে ভেনেজুয়েলার উপকূলে স্কিপার নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে উঠে সেটি জব্দ করে মার্কিন সেনারা। পরে জাহাজটি তেল খালাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে নেওয়া হয় বলে খবর পাওয়া গেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, ট্রাম্পের নৌ অবরোধ ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলার নৌবাহিনী পেট্রোলিয়ামবাহী জাহাজগুলোকে পাহারা দিতে শুরু করেছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যা ও বুধবার সকালে দেশটির পূর্ব উপকূল থেকে কয়েকটি জাহাজ নৌবাহিনীর নিরাপত্তায় রওনা দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ওয়াশিংটন ও কারাকাসের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় যুদ্ধের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন লাতিন আমেরিকার নেতারা ও জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম জাতিসংঘকে ভেনেজুয়েলায় সহিংসতা ঠেকাতে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এখনও জাতিসংঘকে দেখা যাচ্ছে না। রক্তপাত ঠেকাতে তাদের ভূমিকা নিতে হবে। তিনি আবারও ভেনেজুয়েলায় হস্তক্ষেপ ও বিদেশি আগ্রাসনের বিরোধিতা করেছেন।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেন, লাতিন আমেরিকা নিয়ে ট্রাম্পের অবস্থান ও হুমকিতে তিনি উদ্বিগ্ন। তিনি জানান, চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনালাপে কারাকাস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সংলাপের তাগিদ দেন। কথার শক্তি বন্দুকের শক্তিকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ভেনেজুয়েলায় মাদুরো জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসের সঙ্গে ফোনালাপে মার্কিন নৌ অবরোধের নিন্দা জানান বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তিনি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ঔপনিবেশিক হুমকির সাম্প্রতিক বৃদ্ধির অভিযোগ তোলেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ভেনেজুয়েলার প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে মন্তব্যকে বর্বর কূটনীতি বলে আখ্যা দিয়েছেন।
রিপোর্টারের নাম 





















