ঢাকা ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬টি সেবায় কার্যকর হলো বর্ধিত ট্যারিফ, উদ্বেগ ব্যবসায়ীদের

ব্যবসায়ীদের আপত্তি উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬টি সেবার বিপরীতে বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে এই নতুন ট্যারিফ কার্যকর হয়। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশে এক মাস বিলম্বে তা কার্যকর করা হলো।

বর্ধিত ট্যারিফ প্ল্যান অনুসারে, ৫৬টি সেবার মাশুল গড়ে প্রায় ৪১ শতাংশ বাড়ছে। তবে টাগ বোট সার্ভিস এবং পাইলট চার্জসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাশুল বৃদ্ধির হার দুই থেকে চার গুণ পর্যন্ত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা নতুন মাশুল স্থগিত রেখে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মাশুল নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দিতে মাশুল বাড়ানো হচ্ছে এবং এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে। এর ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে এবং সার্বিকভাবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি সিএমএ-সিজিএম চার্জ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির খরচ বেড়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

ঘোষিত গেজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পণ্যভর্তি প্রতি টিইইউস (২০ ফুট একক) কনটেইনারে বর্তমানে গড়ে মাশুল দিতে হবে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা, যা আগে ছিল প্রায় ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা। নতুন ট্যারিফ অনুযায়ী, কনটেইনার ওঠানো-নামানোর চার্জ ৪৩ দশমিক ৪০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬৮ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের পাইলটিং চার্জ ৩৫৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮০০ ডলার করা হয়েছে। প্রতি টিইইউ কনটেইনারের জন্য গ্যান্ট্রি ক্রেন চার্জ ১৫ ডলারের বদলে ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৮০ ডলার। অন্যান্য কনভেনশনাল কার্গোর রিভার ডিউজ এবং ওয়্যারফেজ চার্জও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা এই মাশুল বৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করেছেন। সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, বন্দর একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করে মাশুল বাড়ানোর দায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে শিপিং কোম্পানিরাও তাদের চার্জ সমন্বয় করছে এবং জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে, যা আমদানি-রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন মনে করেন, আমদানি খরচ বাড়লে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দামের ওপর এর প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল কবীর সুজন জানান, তারা আলোচনায় মাশুল ১০-১৫ শতাংশের বেশি না বাড়ানোর অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে সব ধরনের সেবায় গড়ে ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়ানো হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন, বর্ধিত এই ব্যয় শেষমেশ ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে। রেফার কনটেইনারে আমদানি করা ফল, রসুন, আদা, মাছ-মাংসের দামও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম।

তবে বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক মনে করেন, এই মাশুল বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তাপর্যায়ে পড়বে না। তিনি বলেন, বাল্ক পণ্যে বিদ্যমান রেটে প্রতি কেজিতে ৩২ পয়সা খরচ পড়ত, এখন বর্ধিত ট্যারিফে তা কেজিপ্রতি ৪৪ পয়সা খরচ হবে—অর্থাৎ প্রতি কেজিতে মাত্র ১২ পয়সা খরচ বাড়বে। তাঁর মতে, ভোক্তাদের জন্য এই ১২ পয়সা বেশি দেওয়া কোনো বড় বিষয় নয়।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন্স কাপে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাভানের ঐতিহাসিক অভিষেক

চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬টি সেবায় কার্যকর হলো বর্ধিত ট্যারিফ, উদ্বেগ ব্যবসায়ীদের

আপডেট সময় : ০৩:৪৮:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৫

ব্যবসায়ীদের আপত্তি উপেক্ষা করে চট্টগ্রাম বন্দরে ৫৬টি সেবার বিপরীতে বর্ধিত ট্যারিফ কার্যকর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। মঙ্গলবার (১৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে এই নতুন ট্যারিফ কার্যকর হয়। এর আগে ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে এটি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও, নৌ-পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের নির্দেশে এক মাস বিলম্বে তা কার্যকর করা হলো।

বর্ধিত ট্যারিফ প্ল্যান অনুসারে, ৫৬টি সেবার মাশুল গড়ে প্রায় ৪১ শতাংশ বাড়ছে। তবে টাগ বোট সার্ভিস এবং পাইলট চার্জসহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে মাশুল বৃদ্ধির হার দুই থেকে চার গুণ পর্যন্ত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তে বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা নতুন মাশুল স্থগিত রেখে ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে মাশুল নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, বিদেশি অপারেটরদের সুবিধা দিতে মাশুল বাড়ানো হচ্ছে এবং এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী হবে। এর ফলে রপ্তানি প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমবে এবং সার্বিকভাবে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এরইমধ্যে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি সিএমএ-সিজিএম চার্জ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির খরচ বেড়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।

ঘোষিত গেজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, পণ্যভর্তি প্রতি টিইইউস (২০ ফুট একক) কনটেইনারে বর্তমানে গড়ে মাশুল দিতে হবে ১৬ হাজার ২৪৩ টাকা, যা আগে ছিল প্রায় ১১ হাজার ৮৪৯ টাকা। নতুন ট্যারিফ অনুযায়ী, কনটেইনার ওঠানো-নামানোর চার্জ ৪৩ দশমিক ৪০ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৬৮ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের পাইলটিং চার্জ ৩৫৭ ডলার থেকে বাড়িয়ে ৮০০ ডলার করা হয়েছে। প্রতি টিইইউ কনটেইনারের জন্য গ্যান্ট্রি ক্রেন চার্জ ১৫ ডলারের বদলে ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৮০ ডলার। অন্যান্য কনভেনশনাল কার্গোর রিভার ডিউজ এবং ওয়্যারফেজ চার্জও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ানো হয়েছে।

বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা এই মাশুল বৃদ্ধির তীব্র সমালোচনা করেছেন। সিকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, বন্দর একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি করে মাশুল বাড়ানোর দায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ জানান, এই সিদ্ধান্তের ফলে শিপিং কোম্পানিরাও তাদের চার্জ সমন্বয় করছে এবং জাহাজ ও কনটেইনার ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে, যা আমদানি-রপ্তানিকারকদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম স্বপন মনে করেন, আমদানি খরচ বাড়লে ভোক্তাপর্যায়ে পণ্যের দামের ওপর এর প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক খায়রুল কবীর সুজন জানান, তারা আলোচনায় মাশুল ১০-১৫ শতাংশের বেশি না বাড়ানোর অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু বাস্তবে সব ধরনের সেবায় গড়ে ৪১ শতাংশ মাশুল বাড়ানো হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন, বর্ধিত এই ব্যয় শেষমেশ ভোক্তার ওপরই চাপ সৃষ্টি করবে। রেফার কনটেইনারে আমদানি করা ফল, রসুন, আদা, মাছ-মাংসের দামও বাড়বে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম।

তবে বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক মনে করেন, এই মাশুল বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তাপর্যায়ে পড়বে না। তিনি বলেন, বাল্ক পণ্যে বিদ্যমান রেটে প্রতি কেজিতে ৩২ পয়সা খরচ পড়ত, এখন বর্ধিত ট্যারিফে তা কেজিপ্রতি ৪৪ পয়সা খরচ হবে—অর্থাৎ প্রতি কেজিতে মাত্র ১২ পয়সা খরচ বাড়বে। তাঁর মতে, ভোক্তাদের জন্য এই ১২ পয়সা বেশি দেওয়া কোনো বড় বিষয় নয়।