বিশ্বব্যাপী ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের সর্বশেষ নজির স্থাপন করলো চিলি। দেশটিতে সদ্য সমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন কট্টর ডানপন্থি নেতা জোসে অ্যান্তোনিও ক্যাস্ত। তিন দশকেরও বেশি সময় পর দেশটির সাধারণ জনগণের মধ্যে ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবণতা এটি।
নিরাপত্তা জোরদার, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধ দমনের মতো বাগাড়ম্বর ছিল তার নির্বাচনি প্রচারণার প্রধান অঙ্গীকার। এছাড়া, তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ নীতি এবং ধর্ষণের শিকারদের ক্ষেত্রেও গর্ভপাতের কট্টর বিরোধী।
ক্যাস্তের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী জ্যানেত জারা। তৃতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট পদে লড়াই করা ক্যাস্ত এবার ৫৮ শতাংশ ভোট পেয়ে সুস্পষ্ট বিজয় অর্জন করেছেন।
১৯৯০ সালে পিনোশের সামরিক শাসনের অবসানের পর থেকে এটি চিলের সবচেয়ে বড় দক্ষিণপন্থি ঝোঁকের নজির। অগাস্তো পিনোশে ১৯৭৩ সালে মার্কিন সমর্থিত অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ১৭ বছর দীর্ঘ সামরিক শাসন কায়েম করেছিলেন, যা মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম এবং মুক্ত-বাজার নীতির জন্য কুখ্যাত। ক্যাস্তের ভাই পিনোশের সময় মন্ত্রী ছিলেন এবং তার বাবা ছিলেন নাৎজি পার্টির সদস্য। আর পিনোশের প্রতি নিজের ভক্তির কথা প্রকাশ্যের উচ্চারণ করেছেন ক্যাস্ত।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে তিনি বলেন, চিলি আবার অপরাধ, উদ্বেগ এবং ভয় থেকে মুক্ত হবে। অপরাধী ও দুষ্কৃতীকারীদের দৌরাত্ম কমে আসবে। আমরা তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনব এবং কারাবন্দি করব।
অগাস্টিনা ট্রানকোসো নামের এক সমর্থক বলেন, আমরা দেশের নিরাপত্তা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারব ভেবে আনন্দিত।
আরেকজন ভোটার বেলেম ভ্যালদিভিয়েসো বলেন, চিলির রাস্তা আগে শান্তিপূর্ণ ছিল। সম্প্রতি নিরাপত্তার সমস্যা বেড়েছে। আশা করছি ক্যাস্ত তার প্রতিশ্রুতি রাখবেন এবং নিরাপত্তার দিকে মনোযোগ দেবেন।
বুলির যত ফুলঝুরি
প্রচারণাকালে চিলিকে অসংগঠিত ও অনিরাপদ দেশ হিসেবে তুলে ধরেছেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ভক্ত ক্যাস্ত প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক সাশ্রয়ে মনোযোগ দেবেন।
পাশাপাশি তিনি অঙ্গীকার করেন, প্রতিবেশী পেরু এবং বলিভিয়ার সঙ্গে চিলি সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ , সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার তৈরি এবং অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপকহারে বিতাড়ন করা হবে।
লাতিন আমেরিকার তুলনামূলক নিরাপদ এবং স্থিতিশীল একটি দেশ হলেও, সম্প্রতি চিলিতে অবৈধ অভিবাসন ও সংঘবদ্ধ অপরাধ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নাগরিকদের উদ্বেগের কারণ। ক্যাস্ত প্রায়ই এই দুইয়ের সংযোগ দেখিয়ে ভোট টেনেছেন।
তবে সমালোচকরা মনে করেন সমস্যা অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে। চিলিতে হত্যার হার বর্তমানে কমছে, এবং কিছু গবেষণা দেখায়, বিদেশে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিরা গড়ে কম অপরাধ করে। তবুও, অনিরাপত্তার ধারণাই কাস্টের অনেক ভোটারকে প্রভাবিত করেছে।
একজন ভোটার, ম্যাক্স স্ট্রুবার বলেন, আমরা এখন কলম্বিয়ার মতো হয়ে যাচ্ছি। সন্ত্রাস, চুরি-ডাকাতির কারণে সমাজ অনেকটাই অনিরাপদ। হয়তো রূঢ় শোনায়, কিন্তু আমাদের উচিত পিনোশের কাজ চালিয়ে যাওয়া। সে সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছিল, এটা সত্য। তবে সামাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা ছিল।
অবশ্য, সান্তিয়াগোর একজন ভোটার জাভিয়েরা কারাস্কো বলেন, কাস্টের কিছু নীতি ভালো মনে হলেও, আমি কমিউনিস্ট পার্টির জারাকে ভোট দিয়েছি। মনে হয় নিরাপত্তার বয়ান এখানে বেশি বিস্তার পাচ্ছে। অথচ অনেক দেশে আমাদের চেয়ে অনেক খারাপ ঘটনা ঘটছে।
এদিকে, নির্বাচনের পর ক্যাস্তের প্রতি শুভকামনা জানিয়ে জারা পোস্ট করেন, গণতন্ত্র তার রায় দিয়েছে। আমরা আমাদের দেশের উন্নত জীবনযাত্রা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ চালিয়ে যাব।
তবে জারার সমর্থকদের ভয়, ক্যাস্তের বিজয়ের মধ্য দিয়ে চিলি অতীতের চরম ডানপন্থি আমলে ফিরে যাওয়ার পথে হাঁটছে।
রিকার্ডো হেরেরা বলেন, ক্যাস্তের পরিবার অভ্যুত্থানকালীণ স্বৈরাচার অগুস্তো পিনোশেকে সহায়তা করেছে। আমি পিনোচেটের শাসনকাল দেখেছি, সেটা ভয়ঙ্কর ছিল।
তবে, অন্যরা মনে করছেন, ক্যাস্ত যা বলেছেন, তা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। হেক্টর লুনেস বলেন, কাস্ট বলেছেন তিন লাখ ৬০ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে বিতাড়িত করবেন। এটা সম্ভব নয়।
আগামী ১১ মার্চ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন ক্যাস্ত। নিয়মিত সমাবেশে এবং ভাষণ প্রদানকালে সে পর্যন্ত কাউন্টডাউন করেন তিনি। অবৈধ অভিবাসীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, চিলিতে আর কখনও ফিরে আসার সুযোগ পেতে চাইলে, তার হবু প্রশাসনের হাতে ধরা পড়ার আগেই দেশত্যাগ করা উচিত।
অবশ্য, ক্যাস্তের বিজয়ে খুশি হতে পারেন বিনিয়োগকারীরা। কারণ তার মুক্তবাজার অর্থনীতির অঙ্গীকার শিল্পে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ শিথিলের ইঙ্গিত দেয়।
সূত্র: বিবিসি
রিপোর্টারের নাম 






















