ঢাকা ১১:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ০২ মার্চ ২০২৬

ভারতীয় সেনাবাহিনী: নিরপেক্ষ নাকি হিন্দুত্বের নতুন হাতিয়ার?

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৪:১৫:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫
  • ২৪ বার পড়া হয়েছে

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে ভারতের সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে হিন্দুধর্মের প্রতীক ও পুরাণের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী এই সামরিক বাহিনীর শত বছরের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। এই বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি নয়াদিল্লিভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাহুল বেদী ভারতের ‘দ্য ওয়্যারে’ একটি মতামত লিখেছেন, যার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ নিচে তুলে ধরা হলো।

সেনাবাহিনীতে ধর্মের সংবেদনশীল বিভাজন

ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে ২০২১ সালে লেফটেন্যান্ট স্যামুয়েল কমলেসানকে বরখাস্ত করা হয়। খ্রিস্টধর্মাবলম্বী এই সেনা কর্মকর্তা তার রেজিমেন্টের মন্দির ও গুরুদুয়ারার পবিত্র স্থানে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে তিনি আইনি প্রতিকার চাইলে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট তাকে পুনর্বহাল করতে অস্বীকৃতি জানান। এই ঘটনাটি ধর্মের দিক থেকে বৈচিত্র্যময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিভাজনরেখাটিকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে ধর্ম নিয়ে বিভাজন পুরোনো হলেও এত দিন তা কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এতদিন এই বিষয়টি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকত এবং সংবেদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার দোহাই দিয়ে তা চেপে রাখা হতো। কমলেসানকে বরখাস্তের আদেশের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর এত বছরের স্পর্শকাতর বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। এটি কেবল একজন সেনা কর্মকর্তাকে ধর্মীয় কারণে বরখাস্ত করার ঘটনা নয়, বরং সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি গভীর সমস্যার উন্মোচন, যা পুরো বাহিনীকে অস্বস্তিতে ফেলেছে এবং অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের এ বিষয়ে সাবধানী পর্যবেক্ষণ দিতে বাধ্য করেছে।

অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলরা সম্প্রতি সংবাদপত্রে মতামত লিখে বলতে চেষ্টা করেছেন যে, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ধীরে ধীরে একটি ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ গড়ে উঠছে। বাহিনীতে দেশপ্রেম, বিশ্বাসযোগ্যতা ও জাতীয় সংহতিকে দেশের প্রধান ধর্মের দৃশ্যমান অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এই ধরনের পরিবর্তন ভারতীয় সেনাবাহিনীর রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার মূল নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়োগব্যবস্থা কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য থেকে গড়ে উঠেছে। সেনাবাহিনী দেশের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সমাজের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত বাহিনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই বাহিনীই গত এক দশকে বিমানবাহিনী বা নৌবাহিনীর তুলনায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তিতে ফাটল

ভারতের বিমান ও নৌবাহিনীর নিয়োগব্যবস্থা মূলত প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক। এই দুই বাহিনীতে প্রযুক্তিতে দক্ষ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীতে নিয়োগের সামাজিক ভিত্তি অনেক বেশি বিস্তৃত। অঞ্চল, জাতি ও সম্প্রদায়গত সম্পর্ক এই বাহিনীর গভীরে প্রোথিত। এই প্রথা উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে। এই বিস্তৃতি সেনাবাহিনীটিকে সমাজ বা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতি অধিকতর সংবেদনশীল করে তুলেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়—জনসম্পৃক্ততা। সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী অন্য দুই বাহিনীর তুলনায় বেশি কাজ করে। বিদ্রোহ দমন, দুর্যোগে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা এবং অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হয়।

এসব কারণে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামাজিক চাপের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর এমন কোনো চাপ নেই।

জনসম্মুখে ব্যাপক উপস্থিতি সেনাবাহিনীকে আরও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন তিনটি সরকারের টানা শাসন এই সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি নাজুক করে তুলেছে। এর ফলস্বরূপ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের বিন্যাস (ফরমেশন), সামরিক অভিযান, মহড়া এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের নামকরণে ধর্মীয় প্রতীক ও হিন্দু পুরাণ যুক্ত হতে শুরু করেছে। দেব-দেবী, পৌরাণিক মহাকাব্য ও প্রতীকী যোদ্ধাদের আলোচনা একসময় রেজিমেন্টের অনানুষ্ঠানিক কাহিনি ও ইউনিটের লঙ্গরখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন এসব বিষয়কে সেনাবাহিনীর দাপ্তরিক নামকরণ ও নীতিমালায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতীক ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে এলেও এখন তা বদলাতে শুরু করেছে। ক্রমশ তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মের প্রতীককে গ্রহণ করতে শুরু করেছে, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না।

ভাবাদর্শের আড়ালে ‘প্রজেক্ট উদ্ভব’

এই পরিবর্তনগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে না। সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব একটি বৃহত্তর ভাবাদর্শের প্রেক্ষাপটে এ পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করছেন এবং সেটার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করছেন। তারা প্রায়শই এই পরিবর্তনকে ‘উপনিবেশবিরোধী’ হিসেবে দেখাতে চেষ্টা করেন।

তবে বাস্তবতা হলো, নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকের সেনা সদর দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুসরণ করছেন। এই রাজনীতিবিদরা সশস্ত্র বাহিনীকে ‘আত্মনির্ভর’ বা স্বদেশি করাটাকে ‘সভ্যতার মিশন’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সেনাবাহিনী থেকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিদেশি প্রথা’ দূর করাকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং তা অর্জনের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তারা এসব প্রথাকে এমন এক কাল্পনিক সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করছেন, যা হয়তো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থেকে নেওয়া হয়েছে, অথবা গৌরবময় অতীত থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার একটি উদাহরণ হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২০২৩ সালের শেষ দিকে নেওয়া ‘প্রজেক্ট উদ্ভব’ উদ্যোগটি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো—‘প্রাচীন জ্ঞানকে আধুনিক সামরিক অনুশীলনের সঙ্গে সংযুক্ত করা’, যাতে আধুনিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি অনন্য ও সমন্বিত পদ্ধতি তৈরি করা যায়।

সেনা এবং থিঙ্কট্যাংক দ্য ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া যৌথভাবে ‘প্রজেক্ট উদ্ভব’ চালু করেছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো ভারতের পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতা-ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রাচীন জ্ঞান আধুনিক সময়েও কীভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রযোজ্য হতে পারে, তা সেমিনার, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে উপস্থাপন করা।

‘প্রজেক্ট উদ্ভব’ প্রাচীন ভারতের কৌশলগত ও দার্শনিক ভাবনাকে সমসাময়িক সামরিক চিন্তাধারার সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। এর জন্য সেনা কর্মকর্তাদের চাণক্যের অর্থশাস্ত্র, মৌর্য সাম্রাজ্য-পরবর্তী সময়ের প্রাচীন হিন্দু নীতিশাস্ত্র কামান্দক (নীতিসার) এবং তামিল সাধু-কবি তিরুভল্লুভারের (তিরুক্কুরাল) রচনাবলিসহ চিরায়ত (ক্ল্যাসিক্যাল) গ্রন্থ পাঠ এবং ঐতিহাসিক নানা প্রথা খতিয়ে দেখতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ভারতের প্রতিরক্ষা বিভাগ এসব গ্রন্থকে ‘আধুনিক সামরিক নৈতিকতা, সঠিক যুদ্ধনীতি ও জেনেভা কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করেছে।

সেনাপ্রধানের মন্দিরে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক

ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কখনো একা, আবার কখনোবা রাজনীতিবিদের সঙ্গে মন্দিরে গেছেন। তিনি গেরুয়া পোশাক পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করেছেন। রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সেনাবাহিনীর প্রধানের এমন সফর নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিজেপি এই আচরণকে ব্যক্তিগত ধর্ম পালনের অধিকার বলে সমর্থন করার চেষ্টা করলেও বিশেষজ্ঞরা সেনাপ্রধানের এই ধরনের আচরণ নিয়ে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডি এস হুদা লিখেছেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেন। কিন্তু এসব কার্যক্রমের ছবি সরকারিভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের প্রয়োজন না থাকলেও সম্প্রতি এই প্রবণতা বাড়ছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গত মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর সামরিক ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় আধ্যাত্মিক নেতা জগদগুরু রামভদ্রাচার্যের আশ্রমে যান সেনাপ্রধান দ্বিবেদী। এই সাক্ষাৎকারটি জনসমক্ষে প্রচারিত হওয়ার পর সামরিক ইউনিফর্মে সেনাপ্রধানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সফর নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়।

সাক্ষাৎকারের পর ভারতের সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) রামভদ্রাচার্য বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধানকে রাম–মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছি।’ তার ভাষায়, ‘সেই একই মন্ত্র, যা হনুমান লঙ্কা জয়ের আগে সীতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন।’ এই গুরু আরও বলেন, ‘যখন দক্ষিণার প্রসঙ্গ এল, তখন আমি তাঁকে (সেনাপ্রধান) বললাম, আমি এমন দক্ষিণা চাই, যা কোনো শিক্ষক কখনো চাননি। আমি বললাম, আমি আমার দক্ষিণা হিসেবে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর চাই। সেনাপ্রধান আমার অনুরোধ গ্রহণ করেন এবং জানান, ভারত পাকিস্তানকে “উপযুক্ত জবাব” দিতে প্রস্তুত।’

একদিকে সেনাপ্রধানের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসের এমন প্রদর্শনী এবং অন্যদিকে লেফটেন্যান্ট কমলেশনের ঘটনা সেনাবাহিনীতে প্রাতিষ্ঠানিক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

চূড়ান্ত বিচারে সেনাবাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা ধর্মীয় বা সংস্কৃতির প্রদর্শনের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা সেবাদান, দক্ষতা এবং দেশের প্রতি আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। সুপ্রিম কোর্ট কমলেশনকে পুনর্বহাল করতে অস্বীকৃতি জানালেও, যতক্ষণ পর্যন্ত সেনাবাহিনী নিজে তার পেশাদারিত্বকে বাহিনীর কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারছে এবং সেনাসদস্য ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থেকে আলাদা করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আদেশ তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না, বরং তা প্রতীকীই থেকে যাবে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

নেতানিয়াহুকে মোদির ফোন, কী কথা হলো

ভারতীয় সেনাবাহিনী: নিরপেক্ষ নাকি হিন্দুত্বের নতুন হাতিয়ার?

আপডেট সময় : ০৪:১৫:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর ২০২৫

ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে ভারতের সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে হিন্দুধর্মের প্রতীক ও পুরাণের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দেশটির অন্যতম প্রভাবশালী এই সামরিক বাহিনীর শত বছরের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। এই বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি নয়াদিল্লিভিত্তিক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক রাহুল বেদী ভারতের ‘দ্য ওয়্যারে’ একটি মতামত লিখেছেন, যার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ নিচে তুলে ধরা হলো।

সেনাবাহিনীতে ধর্মের সংবেদনশীল বিভাজন

ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে ২০২১ সালে লেফটেন্যান্ট স্যামুয়েল কমলেসানকে বরখাস্ত করা হয়। খ্রিস্টধর্মাবলম্বী এই সেনা কর্মকর্তা তার রেজিমেন্টের মন্দির ও গুরুদুয়ারার পবিত্র স্থানে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। বহিষ্কারাদেশের বিরুদ্ধে তিনি আইনি প্রতিকার চাইলে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট তাকে পুনর্বহাল করতে অস্বীকৃতি জানান। এই ঘটনাটি ধর্মের দিক থেকে বৈচিত্র্যময় ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিভাজনরেখাটিকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে ধর্ম নিয়ে বিভাজন পুরোনো হলেও এত দিন তা কখনো প্রকাশ্যে আসেনি। এতদিন এই বিষয়টি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকত এবং সংবেদনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিকতার দোহাই দিয়ে তা চেপে রাখা হতো। কমলেসানকে বরখাস্তের আদেশের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর এত বছরের স্পর্শকাতর বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে আসে। এটি কেবল একজন সেনা কর্মকর্তাকে ধর্মীয় কারণে বরখাস্ত করার ঘটনা নয়, বরং সেনাবাহিনীর ভেতরে একটি গভীর সমস্যার উন্মোচন, যা পুরো বাহিনীকে অস্বস্তিতে ফেলেছে এবং অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলদের এ বিষয়ে সাবধানী পর্যবেক্ষণ দিতে বাধ্য করেছে।

অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলরা সম্প্রতি সংবাদপত্রে মতামত লিখে বলতে চেষ্টা করেছেন যে, ভারতীয় সেনাবাহিনীতে ধীরে ধীরে একটি ‘নতুন স্বাভাবিকতা’ গড়ে উঠছে। বাহিনীতে দেশপ্রেম, বিশ্বাসযোগ্যতা ও জাতীয় সংহতিকে দেশের প্রধান ধর্মের দৃশ্যমান অনুসরণের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে। এই ধরনের পরিবর্তন ভারতীয় সেনাবাহিনীর রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার মূল নীতির সম্পূর্ণ বিপরীত।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়োগব্যবস্থা কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য থেকে গড়ে উঠেছে। সেনাবাহিনী দেশের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে দৃশ্যমান ও সমাজের সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে যুক্ত বাহিনী হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই বাহিনীই গত এক দশকে বিমানবাহিনী বা নৌবাহিনীর তুলনায় রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়ে অনেক বেশি স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।

বিস্তৃত সামাজিক ভিত্তিতে ফাটল

ভারতের বিমান ও নৌবাহিনীর নিয়োগব্যবস্থা মূলত প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক। এই দুই বাহিনীতে প্রযুক্তিতে দক্ষ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীতে নিয়োগের সামাজিক ভিত্তি অনেক বেশি বিস্তৃত। অঞ্চল, জাতি ও সম্প্রদায়গত সম্পর্ক এই বাহিনীর গভীরে প্রোথিত। এই প্রথা উনিশ শতকের মাঝামাঝি ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসছে। এই বিস্তৃতি সেনাবাহিনীটিকে সমাজ বা রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতি অধিকতর সংবেদনশীল করে তুলেছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়—জনসম্পৃক্ততা। সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে সেনাবাহিনী অন্য দুই বাহিনীর তুলনায় বেশি কাজ করে। বিদ্রোহ দমন, দুর্যোগে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা এবং অশান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীকে প্রতিনিয়ত সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হয়।

এসব কারণে সেনাবাহিনী রাজনৈতিক যোগাযোগ ও সামাজিক চাপের প্রতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে বিচ্ছিন্ন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিমান ও নৌবাহিনীর ওপর এমন কোনো চাপ নেই।

জনসম্মুখে ব্যাপক উপস্থিতি সেনাবাহিনীকে আরও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব বলয়ের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন তিনটি সরকারের টানা শাসন এই সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি নাজুক করে তুলেছে। এর ফলস্বরূপ, ভারতীয় সেনাবাহিনীর যুদ্ধক্ষেত্রের বিন্যাস (ফরমেশন), সামরিক অভিযান, মহড়া এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের নামকরণে ধর্মীয় প্রতীক ও হিন্দু পুরাণ যুক্ত হতে শুরু করেছে। দেব-দেবী, পৌরাণিক মহাকাব্য ও প্রতীকী যোদ্ধাদের আলোচনা একসময় রেজিমেন্টের অনানুষ্ঠানিক কাহিনি ও ইউনিটের লঙ্গরখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন এসব বিষয়কে সেনাবাহিনীর দাপ্তরিক নামকরণ ও নীতিমালায় আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতীক ও আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষ মূল্যবোধের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে এলেও এখন তা বদলাতে শুরু করেছে। ক্রমশ তা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মের প্রতীককে গ্রহণ করতে শুরু করেছে, যা একসময় কল্পনাও করা যেত না।

ভাবাদর্শের আড়ালে ‘প্রজেক্ট উদ্ভব’

এই পরিবর্তনগুলো বিচ্ছিন্নভাবে ঘটছে না। সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্ব একটি বৃহত্তর ভাবাদর্শের প্রেক্ষাপটে এ পরিবর্তনের রূপরেখা তৈরি করছেন এবং সেটার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করছেন। তারা প্রায়শই এই পরিবর্তনকে ‘উপনিবেশবিরোধী’ হিসেবে দেখাতে চেষ্টা করেন।

তবে বাস্তবতা হলো, নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকের সেনা সদর দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্বের নির্দেশনা অনুসরণ করছেন। এই রাজনীতিবিদরা সশস্ত্র বাহিনীকে ‘আত্মনির্ভর’ বা স্বদেশি করাটাকে ‘সভ্যতার মিশন’ হিসেবে উপস্থাপন করছেন। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা সেনাবাহিনী থেকে ‘উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত বিদেশি প্রথা’ দূর করাকে লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং তা অর্জনের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন। তারা এসব প্রথাকে এমন এক কাল্পনিক সাংস্কৃতিক বিশুদ্ধতা দিয়ে প্রতিস্থাপন করছেন, যা হয়তো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থেকে নেওয়া হয়েছে, অথবা গৌরবময় অতীত থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ার একটি উদাহরণ হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২০২৩ সালের শেষ দিকে নেওয়া ‘প্রজেক্ট উদ্ভব’ উদ্যোগটি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো—‘প্রাচীন জ্ঞানকে আধুনিক সামরিক অনুশীলনের সঙ্গে সংযুক্ত করা’, যাতে আধুনিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি অনন্য ও সমন্বিত পদ্ধতি তৈরি করা যায়।

সেনা এবং থিঙ্কট্যাংক দ্য ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউশন অফ ইন্ডিয়া যৌথভাবে ‘প্রজেক্ট উদ্ভব’ চালু করেছে। প্রকল্পটির লক্ষ্য হলো ভারতের পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো সভ্যতা-ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রাচীন জ্ঞান আধুনিক সময়েও কীভাবে প্রাসঙ্গিক ও প্রযোজ্য হতে পারে, তা সেমিনার, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে উপস্থাপন করা।

‘প্রজেক্ট উদ্ভব’ প্রাচীন ভারতের কৌশলগত ও দার্শনিক ভাবনাকে সমসাময়িক সামরিক চিন্তাধারার সঙ্গে মিলিয়ে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে। এর জন্য সেনা কর্মকর্তাদের চাণক্যের অর্থশাস্ত্র, মৌর্য সাম্রাজ্য-পরবর্তী সময়ের প্রাচীন হিন্দু নীতিশাস্ত্র কামান্দক (নীতিসার) এবং তামিল সাধু-কবি তিরুভল্লুভারের (তিরুক্কুরাল) রচনাবলিসহ চিরায়ত (ক্ল্যাসিক্যাল) গ্রন্থ পাঠ এবং ঐতিহাসিক নানা প্রথা খতিয়ে দেখতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ভারতের প্রতিরক্ষা বিভাগ এসব গ্রন্থকে ‘আধুনিক সামরিক নৈতিকতা, সঠিক যুদ্ধনীতি ও জেনেভা কনভেনশনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করেছে।

সেনাপ্রধানের মন্দিরে যাওয়া নিয়ে বিতর্ক

ভারতের সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কখনো একা, আবার কখনোবা রাজনীতিবিদের সঙ্গে মন্দিরে গেছেন। তিনি গেরুয়া পোশাক পরে প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা করেছেন। রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ সেনাবাহিনীর প্রধানের এমন সফর নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিজেপি এই আচরণকে ব্যক্তিগত ধর্ম পালনের অধিকার বলে সমর্থন করার চেষ্টা করলেও বিশেষজ্ঞরা সেনাপ্রধানের এই ধরনের আচরণ নিয়ে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন।

অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল ডি এস হুদা লিখেছেন, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যেতে পারেন। কিন্তু এসব কার্যক্রমের ছবি সরকারিভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের প্রয়োজন না থাকলেও সম্প্রতি এই প্রবণতা বাড়ছে।

এমন এক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গত মে মাসে ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পর সামরিক ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় আধ্যাত্মিক নেতা জগদগুরু রামভদ্রাচার্যের আশ্রমে যান সেনাপ্রধান দ্বিবেদী। এই সাক্ষাৎকারটি জনসমক্ষে প্রচারিত হওয়ার পর সামরিক ইউনিফর্মে সেনাপ্রধানের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সফর নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়।

সাক্ষাৎকারের পর ভারতের সংবাদ সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়াকে (পিটিআই) রামভদ্রাচার্য বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধানকে রাম–মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছি।’ তার ভাষায়, ‘সেই একই মন্ত্র, যা হনুমান লঙ্কা জয়ের আগে সীতার কাছ থেকে পেয়েছিলেন।’ এই গুরু আরও বলেন, ‘যখন দক্ষিণার প্রসঙ্গ এল, তখন আমি তাঁকে (সেনাপ্রধান) বললাম, আমি এমন দক্ষিণা চাই, যা কোনো শিক্ষক কখনো চাননি। আমি বললাম, আমি আমার দক্ষিণা হিসেবে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর চাই। সেনাপ্রধান আমার অনুরোধ গ্রহণ করেন এবং জানান, ভারত পাকিস্তানকে “উপযুক্ত জবাব” দিতে প্রস্তুত।’

একদিকে সেনাপ্রধানের মতো অতিগুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাসের এমন প্রদর্শনী এবং অন্যদিকে লেফটেন্যান্ট কমলেশনের ঘটনা সেনাবাহিনীতে প্রাতিষ্ঠানিক উত্তেজনা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।

চূড়ান্ত বিচারে সেনাবাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতা ধর্মীয় বা সংস্কৃতির প্রদর্শনের ওপর নির্ভর করে না, বরং তা সেবাদান, দক্ষতা এবং দেশের প্রতি আনুগত্যের ওপর নির্ভরশীল। সুপ্রিম কোর্ট কমলেশনকে পুনর্বহাল করতে অস্বীকৃতি জানালেও, যতক্ষণ পর্যন্ত সেনাবাহিনী নিজে তার পেশাদারিত্বকে বাহিনীর কেন্দ্রে স্থাপন করতে পারছে এবং সেনাসদস্য ও কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা থেকে আলাদা করতে পারছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই আদেশ তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না, বরং তা প্রতীকীই থেকে যাবে।