বর্তমানে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৬০ শতাংশের কোটা অতিক্রম করেছে। প্রতি বছর জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপের সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্কবাণী উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে, নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র দ্রুত আবিষ্কৃত না হলে ২০৩১ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নবম বার্ষিক সম্মেলনের একটি প্যানেল আলোচনায় এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উদ্বেগের বিষয়টি সামনে আসে। অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
সম্মেলনের আলোচনায় সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন সানেমের পরিচালক ইসরাত হোসেন। তিনি বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও এর অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরে উল্লেখ করেন যে, হরমুজ প্রণালিসহ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক পথে প্রতিবন্ধকতা এবং তেল ও এলএনজি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে সংকটে ফেলেছে। এটি শুধু জ্বালানি ঘাটতিই নয়, বরং বিনিয়োগ, বাণিজ্য প্রবাহ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে। অনুষ্ঠানে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম দেশের জ্বালানি কাঠামোর ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের মোট প্রাথমিক জ্বালানি ব্যবহারের প্রায় অর্ধেকই প্রাকৃতিক গ্যাস (যার মধ্যে দেশীয় ও আমদানি করা এলএনজি উভয়ই রয়েছে)। এছাড়া কয়লা থেকে এক-চতুর্থাংশ এবং তেল থেকে ১৫ শতাংশের বেশি জ্বালানি চাহিদা মেটানো হচ্ছে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান এখনও অত্যন্ত নগণ্য।
শফিকুল আলম আরও জানান, ২০২১ সালে জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা যেখানে ৪৮ শতাংশ ছিল, বর্তমানে তা ৬০ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং এর ফলে আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে ১২ বিলিয়ন ডলার। এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে ভর্তুকির চাপও বাড়ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ডিজেল দেশের ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হলেও বৈশ্বিক সংকটে তেল ও এলএনজি সরবরাহে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি দেখা গেছে। স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনার কারণে এক প্রান্তিকেই ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, লোডশেডিং এবং বাজেট ঘাটতির আশঙ্কা থাকলেও শফিকুল আলম একে জ্বালানি বৈচিত্র্য ও নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে যাওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
আলোচনায় ভারতের অধ্যাপক প্রবীর দে তাদের দেশের কৌশল ব্যাখ্যা করে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর জোর দেন। নেপালের অধ্যাপক নাভিন অধিকারী জানান, তাদের দেশে বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ নতুন চার চাকার যানবাহনই বৈদ্যুতিক। শ্রীলঙ্কার উদয়া নামালগামা তাদের দেশের সংকটের কথা তুলে ধরে সতর্ক করেন। এছাড়া বিইআরসি সদস্য ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত ডাটা ব্যবস্থা, কৌশলগত মজুত এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের গুরুত্বারোপ করেন। তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিলম্ব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে পরিবেশবান্ধব নীতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। পরিশেষে বক্তারা এই সংকটকে কার্যকর নীতির মাধ্যমে রূপান্তরমূলক সুযোগে পরিণত করার আহ্বান জানান।
রিপোর্টারের নাম 

























