ঢাকা ০১:৩৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬

প্রশাসনে অস্থিরতা: বেতন কাঠামো ও কঠোর বিধিমালায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ

নতুন সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রশাসনের কাজের গতিতে। বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত তিনটি প্রধান কারণে এই অসন্তোষ দানা বাঁধছে। প্রথমত, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত না হওয়া; দ্বিতীয়ত, বদলি ও পদায়নে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বৃদ্ধি এবং তৃতীয়ত, অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিতে সরকারের কঠোর নির্দেশনা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতন কাঠামোতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় কর্মচারীদের একটি বড় অংশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে এবং প্রশাসনের ভেতরে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব ও সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুমোদিত ১৯ লাখ ১৯ হাজার ১১১টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ শূন্য রয়েছে। কর্মরত ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন কর্মচারীর মধ্যে স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা এবং আইসিটি বিভাগে শূন্য পদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০১৫ সালের পর আর কোনো পে-স্কেল কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি আগামী বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন ও কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি পালন করছে। এদিকে, ২৫ মে ২০২৫ তারিখে জারি করা ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে কর্মচারীরা ‘নিবর্তনমূলক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আন্দোলনে অংশ নিলে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান রাখায় তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং এর প্রতিবাদে সচিবালয়ে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া স্থায়ী পদের বিপরীতে আউটসোর্সিং নিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিয়মিত কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

অন্যদিকে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত দপ্তরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা এবং অনুমতি ছাড়া অফিস ত্যাগের ক্ষেত্রে ছুটি কর্তনের কঠোর নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে অসন্তোষের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মচারীদের দাবি, দূরবর্তী এলাকা থেকে এসে নতুন সময়সূচি মেনে চলা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আকস্মিক পরিদর্শনের কারণে তারা সব সময় চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকছেন। সচিবালয় কর্মচারী সমিতির নেতা আব্দুল খালেক এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীরা জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে। এ বিষয়ে সাবেক অতিরিক্ত সচিব জহুরুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন যে, বিধিনিষেধ মেনে চলা আবশ্যক হলেও অতিরিক্ত কড়াকড়ি প্রশাসনের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। সব মিলিয়ে, সরকারের গঠন করা পর্যালোচনা কমিটি সত্ত্বেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অবিশ্বাসের আবহ বজায় রয়েছে।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

Mahbub

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় প্রধান বাধা ৩টি: প্রেসিডেন্ট

প্রশাসনে অস্থিরতা: বেতন কাঠামো ও কঠোর বিধিমালায় সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ

আপডেট সময় : ০১:২৮:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

নতুন সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রশাসনের কাজের গতিতে। বাংলাদেশ সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত তিনটি প্রধান কারণে এই অসন্তোষ দানা বাঁধছে। প্রথমত, ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত না হওয়া; দ্বিতীয়ত, বদলি ও পদায়নে যোগ্যতার চেয়ে দলীয় আনুগত্যকে প্রাধান্য দেওয়া ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বৃদ্ধি এবং তৃতীয়ত, অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিতে সরকারের কঠোর নির্দেশনা। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বর্তমান বেতন কাঠামোতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ায় কর্মচারীদের একটি বড় অংশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে এবং প্রশাসনের ভেতরে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব ও সমন্বয়হীনতা তৈরি হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুমোদিত ১৯ লাখ ১৯ হাজার ১১১টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ শূন্য রয়েছে। কর্মরত ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৯১ জন কর্মচারীর মধ্যে স্বাস্থ্য, প্রাথমিক শিক্ষা এবং আইসিটি বিভাগে শূন্য পদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ২০১৫ সালের পর আর কোনো পে-স্কেল কার্যকর না হওয়ায় বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি আগামী বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে মানববন্ধন ও কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি পালন করছে। এদিকে, ২৫ মে ২০২৫ তারিখে জারি করা ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’-কে কর্মচারীরা ‘নিবর্তনমূলক’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। আন্দোলনে অংশ নিলে বাধ্যতামূলক অবসরের বিধান রাখায় তাদের মধ্যে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং এর প্রতিবাদে সচিবালয়ে বিক্ষোভ ও কর্মবিরতির ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া স্থায়ী পদের বিপরীতে আউটসোর্সিং নিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ায় নিয়মিত কর্মচারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

অন্যদিকে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত দপ্তরে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করা এবং অনুমতি ছাড়া অফিস ত্যাগের ক্ষেত্রে ছুটি কর্তনের কঠোর নির্দেশনা মাঠপর্যায়ে অসন্তোষের নতুন কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মচারীদের দাবি, দূরবর্তী এলাকা থেকে এসে নতুন সময়সূচি মেনে চলা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে এবং আকস্মিক পরিদর্শনের কারণে তারা সব সময় চাকরি হারানোর আতঙ্কে থাকছেন। সচিবালয় কর্মচারী সমিতির নেতা আব্দুল খালেক এবং মাঠপর্যায়ের কর্মীরা জানান, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিস্থিতি আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে। এ বিষয়ে সাবেক অতিরিক্ত সচিব জহুরুল ইসলাম মন্তব্য করেছেন যে, বিধিনিষেধ মেনে চলা আবশ্যক হলেও অতিরিক্ত কড়াকড়ি প্রশাসনের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনে না। সব মিলিয়ে, সরকারের গঠন করা পর্যালোচনা কমিটি সত্ত্বেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অবিশ্বাসের আবহ বজায় রয়েছে।