ঢাকা ০৭:৩৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বাংলাদেশের: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

  • রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:২৮:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যস্ততা ভেদ করে ঢাকার পথে ছুটে চলা হাজারো কনটেইনারের গায়ে প্রায়ই দেখা মেলে ‘মেড ইন চায়না’ লেখা। এসব কনটেইনারে থাকে বাংলাদেশের শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, পোশাক তৈরির কাঁচামাল কিংবা ইলেকট্রনিক সামগ্রী। অন্যদিকে, একই বন্দর থেকে চীনের দিকে যাত্রা করে চিংড়ি, চামড়া বা পাটের মতো বাংলাদেশি পণ্য। এই আমদানি-রপ্তানির চিত্রই আজ বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের মূল ভিত্তি, যা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। চীনের এই বৈশ্বিক উত্থান বাংলাদেশের জন্য যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমরা কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়।

চীনের প্রভাব কেবল বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পদ্মা সেতু ও এর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বাংলাদেশকে দিয়েছে নতুন গতি। এর ফলে দেশের শিল্প উৎপাদন, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রপ্তানি খাতেও এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সচল রাখতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির এক বিশাল অংশ এখন চীন থেকে আসে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, একটা সময় মূলধনি যন্ত্রপাতির জন্য জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন সেই স্থানটি চীনের দখলে। ফলে চীনা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

চীনের সরবরাহ ব্যবস্থা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে। দ্রুত কাঁচামাল পাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে পোশাক, চামড়া, পাট ও ইলেকট্রনিক্স খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো চীনের সরবরাহের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

অবকাঠামো খাতে চীনের উপস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্ট। পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক, পায়রা বন্দর, কর্ণফুলী টানেল থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় এক্সপ্রেসওয়ে— প্রায় সবখানেই চীনা কোম্পানির সরব উপস্থিতি। চীনের সরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এর অধীনে চীন প্রায় ৩০টির বেশি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে, যার মোট পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ এবং বন্দর সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণে সহায়তা করলেও ঋণের শর্তাবলি ও প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর একটি বড় অংশই এখন চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। হুয়াওয়ে ও জেডটিই’র মতো কোম্পানিগুলো মোবাইল নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক, সিসিটিভি ক্যামেরা এমনকি সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের মতো কোম্পানিকে বর্জন করছে, সেখানে বাংলাদেশ চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি উদার।

চীন শুধু অবকাঠামোতেই নয়, প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েও বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ভূমিকা রাখছে। সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপকল্পের সঙ্গে চীনা প্রযুক্তির সমন্বয় দেশের বাজারে ই-কমার্স, মোবাইল পেমেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সেবার প্রসার ঘটাচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে।

চীনা বিনিয়োগের প্রবাহ সম্প্রতি আরও গতি পেয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে এই বিনিয়োগের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় এক হাজার চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। চট্টগ্রাম ইপিজেডে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে হেডফোন কারখানা স্থাপন থেকে শুরু করে আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক জোনে নতুন শিল্পপার্ক গড়ে তোলা—সবকিছুই এই crescente সম্পর্কের প্রমাণ। বেপজার তথ্যমতে, চীন এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ এবং শ্রমের স্বল্পমূল্যের কারণে অনেক চীনা উদ্যোক্তা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে দেখছেন।

তবে এই সম্পর্কের একটি বড় দুর্বলতা হলো বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৪ সালে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার, যার বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৭০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। যদিও এই আমদানির বড় অংশই শিল্পের কাঁচামাল, যা দেশের উৎপাদন খাতকে সচল রাখছে, তবু এই ভারসাম্যহীনতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সাবেক মহাসচিব আল মামুন মৃধা মনে করেন, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি চীনে রপ্তানি কম হলেও, চীনের কাঁচামাল ব্যবহার করেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিপুল পরিমাণে পণ্য রপ্তানি করছে।

চীনের সঙ্গে এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে জনমনেও ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭৫ শতাংশের বেশি মানুষ চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন এবং উচ্চশিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য চীনকে বেছে নিতে আগ্রহী। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের দৃশ্যমান ভূমিকা এবং অ-রাজনৈতিক কূটনীতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অবশ্য চীনা ঋণনির্ভর উন্নয়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সরকারের মতে, এসব প্রকল্প দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা এবং অনেক প্রকল্পে চীনা ঠিকাদারদের একচেটিয়া অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতাকে সীমিত করে খরচের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশকে এক জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় রপ্তানি বাজার ধরে রাখা, অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন মোড় দেখা যাচ্ছে, যেখানে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদলের চীন সফর এই বহুমুখী কূটনীতিরই ইঙ্গিত দেয়।

চীনের উত্থান বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, ঋণের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার ঝুঁকি মোকাবেলা করাই হবে আগামী দিনের মূল পরীক্ষা। যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্বই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পরবর্তী চালিকাশক্তি।

ট্যাগস :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আসামির খোঁজে পাবনার ভাঙ্গুড়ায় পুলিশের অভিযান: স্ত্রী-ভাই-ভাবীকে মারধরের অভিযোগ, আহত ২ হাসপাতালে

চীনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে বাংলাদেশের: অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

আপডেট সময় : ০৮:২৮:৫২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৫

চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যস্ততা ভেদ করে ঢাকার পথে ছুটে চলা হাজারো কনটেইনারের গায়ে প্রায়ই দেখা মেলে ‘মেড ইন চায়না’ লেখা। এসব কনটেইনারে থাকে বাংলাদেশের শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, পোশাক তৈরির কাঁচামাল কিংবা ইলেকট্রনিক সামগ্রী। অন্যদিকে, একই বন্দর থেকে চীনের দিকে যাত্রা করে চিংড়ি, চামড়া বা পাটের মতো বাংলাদেশি পণ্য। এই আমদানি-রপ্তানির চিত্রই আজ বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের মূল ভিত্তি, যা দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। চীনের এই বৈশ্বিক উত্থান বাংলাদেশের জন্য যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে আমরা কতটা প্রস্তুত, সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড়।

চীনের প্রভাব কেবল বাণিজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পদ্মা সেতু ও এর রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল কিংবা ঢাকার এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি বাংলাদেশকে দিয়েছে নতুন গতি। এর ফলে দেশের শিল্প উৎপাদন, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং রপ্তানি খাতেও এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সচল রাখতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির এক বিশাল অংশ এখন চীন থেকে আসে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, একটা সময় মূলধনি যন্ত্রপাতির জন্য জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র বা দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর নির্ভর করতে হলেও এখন সেই স্থানটি চীনের দখলে। ফলে চীনা কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

চীনের সরবরাহ ব্যবস্থা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে। দ্রুত কাঁচামাল পাওয়ায় স্থানীয় উৎপাদকরা আন্তর্জাতিক বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠছেন। বিশেষ করে পোশাক, চামড়া, পাট ও ইলেকট্রনিক্স খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলো চীনের সরবরাহের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

অবকাঠামো খাতে চীনের উপস্থিতি সবচেয়ে স্পষ্ট। পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক, পায়রা বন্দর, কর্ণফুলী টানেল থেকে শুরু করে দেশের বড় বড় এক্সপ্রেসওয়ে— প্রায় সবখানেই চীনা কোম্পানির সরব উপস্থিতি। চীনের সরকারি ঋণ ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) এর অধীনে চীন প্রায় ৩০টির বেশি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে, যার মোট পরিমাণ এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পাঞ্চল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রেলপথ এবং বন্দর সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই বিনিয়োগ বাংলাদেশের অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণে সহায়তা করলেও ঋণের শর্তাবলি ও প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদী কার্যকারিতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

দেশের ডিজিটাল অবকাঠামোর একটি বড় অংশই এখন চীনা প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। হুয়াওয়ে ও জেডটিই’র মতো কোম্পানিগুলো মোবাইল নেটওয়ার্ক, ফাইবার অপটিক, সিসিটিভি ক্যামেরা এমনকি সরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব ফাইভ-জি নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের মতো কোম্পানিকে বর্জন করছে, সেখানে বাংলাদেশ চীনা প্রযুক্তি ব্যবহারে অনেক বেশি উদার।

চীন শুধু অবকাঠামোতেই নয়, প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েও বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে ভূমিকা রাখছে। সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ রূপকল্পের সঙ্গে চীনা প্রযুক্তির সমন্বয় দেশের বাজারে ই-কমার্স, মোবাইল পেমেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর সেবার প্রসার ঘটাচ্ছে, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে।

চীনা বিনিয়োগের প্রবাহ সম্প্রতি আরও গতি পেয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে এই বিনিয়োগের পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় এক হাজার চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। চট্টগ্রাম ইপিজেডে ৩০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে হেডফোন কারখানা স্থাপন থেকে শুরু করে আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক জোনে নতুন শিল্পপার্ক গড়ে তোলা—সবকিছুই এই crescente সম্পর্কের প্রমাণ। বেপজার তথ্যমতে, চীন এখন বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ এবং শ্রমের স্বল্পমূল্যের কারণে অনেক চীনা উদ্যোক্তা বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে দেখছেন।

তবে এই সম্পর্কের একটি বড় দুর্বলতা হলো বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৪ সালে চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩ বিলিয়ন ডলার, যার বিপরীতে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ৭০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। যদিও এই আমদানির বড় অংশই শিল্পের কাঁচামাল, যা দেশের উৎপাদন খাতকে সচল রাখছে, তবু এই ভারসাম্যহীনতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সাবেক মহাসচিব আল মামুন মৃধা মনে করেন, বাংলাদেশ থেকে সরাসরি চীনে রপ্তানি কম হলেও, চীনের কাঁচামাল ব্যবহার করেই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশে বিপুল পরিমাণে পণ্য রপ্তানি করছে।

চীনের সঙ্গে এই ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক নিয়ে জনমনেও ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭৫ শতাংশের বেশি মানুষ চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন এবং উচ্চশিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য চীনকে বেছে নিতে আগ্রহী। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের দৃশ্যমান ভূমিকা এবং অ-রাজনৈতিক কূটনীতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে।

অবশ্য চীনা ঋণনির্ভর উন্নয়ন নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সরকারের মতে, এসব প্রকল্প দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করছে। তবে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতা এবং অনেক প্রকল্পে চীনা ঠিকাদারদের একচেটিয়া অংশগ্রহণ প্রতিযোগিতাকে সীমিত করে খরচের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

ভূ-রাজনৈতিকভাবেও বাংলাদেশকে এক জটিল ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বড় রপ্তানি বাজার ধরে রাখা, অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি নতুন মোড় দেখা যাচ্ছে, যেখানে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদলের চীন সফর এই বহুমুখী কূটনীতিরই ইঙ্গিত দেয়।

চীনের উত্থান বাংলাদেশের জন্য বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, ঋণের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতার ঝুঁকি মোকাবেলা করাই হবে আগামী দিনের মূল পরীক্ষা। যদি সুশাসন, স্বচ্ছতা ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়া যায়, তবে চীনের সঙ্গে অংশীদারিত্বই হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পরবর্তী চালিকাশক্তি।